গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও দলটির সমর্থকদের ভোট কে পাবে, তা নিয়ে মাঠের রাজনীতিতে নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রকাশ্যে প্রায় সব দল আওয়ামী লীগকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নির্বাচনের বাইরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিলেও, বাস্তবে তাদের সমর্থক ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে কৌশল নিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিসহ একাধিক দল মনে করছে, নিজেদের ঘাঁটির বাইরের ভোটের বড় অংশ হতে পারে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। এ কারণে কোথাও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে টানার চেষ্টা, কোথাও মামলা থেকে রেহাই বা নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভোটের প্রচার জোরদার হলে এসব কৌশল আরও স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘যে নির্বাচনে নৌকা নেই, সেই নির্বাচনে ভোট নয়’—এমন বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। দলটির মিত্র ১৪–দলীয় জোটের শরিকরাও নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অনড়। এতে আওয়ামী লীগের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না গেলেও, নীরব সমর্থকদের ভোট পেলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
অতীতের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের ভোটের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল। তবে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে দলটির প্রতি ভোটারদের আস্থাহানি ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সভাপতি শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকে পলাতক বা কারাগারে থাকায় বর্তমান ভোটব্যাংক কতটা শক্ত, তা স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—প্রার্থীর আদর্শিক অবস্থান, স্থানীয় পর্যায়ে ভোটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গণ-অভ্যুত্থানের পর আচরণ এবং কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকলে তার প্রভাব।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশ ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের ভোট টানতে প্রকাশ্যে নিরাপত্তা ও দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। এনসিপি নেতারা এই প্রবণতাকে সমালোচনা করে বলছেন, অপরাধের দায় উপেক্ষা করে ভোট টানার চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মনোনয়ন কৌশলেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বিএনপি ও জামায়াত হিন্দু প্রার্থী দিচ্ছে, যা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের পতনের পর ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর ধারণা কার্যকর না হওয়ায়, অন্য দলগুলোই এখন তাদের ভোটারদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে।
নাগরিক ঐক্যের নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা যদি সংঘবদ্ধভাবে ভোট না দেন, তাহলে বিচ্ছিন্নভাবে দেওয়া এই ভোটগুলোই অনেক আসনে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে এই নীরব টানাপোড়েন আগামী নির্বাচনের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
















