১০ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার চীনের কাছ থেকে ২০টি জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েছে যার মূল্য প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার)। এই ঘোষণাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই বড় চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের ফেসবুক পোস্টে এই ক্রয়-উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়। তিনি জানান, ২০২৫–২৬ এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মধ্যে চুক্তিটি বাস্তবায়নের আশা করা হচ্ছে। যুদ্ধবিমানগুলো সরাসরি ক্রয় (Direct Purchase) অথবা সরকার থেকে সরকারের (G2G) চুক্তির আওতায় কেনা হতে পারে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে একটি অন্তর্বর্তী বা ট্রানজিশনাল সরকার, যার প্রধান দায়িত্ব মূলত নির্বাচন আয়োজন ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা,তারা কীভাবে এত বড় প্রতিরক্ষা ব্যয় অনুমোদন করছে?
ভূ-রাজনৈতিক ইঙ্গিত: চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা না ভারসাম্যনীতি? বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক নয়, কৌশলগতও। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত—যেখানে চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যেকেই প্রভাব বিস্তারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। চীনের তৈরি জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনা মানে শুধু প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো নয়, বরং এটি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করে আসছে কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন থেকে শুরু করে নৌবাহিনীর সাবমেরিন সরবরাহ পর্যন্ত। এখন বিমানবাহিনীর এই বড় আপগ্রেড চীনের সামরিক শিল্পকে বাংলাদেশে আরও গভীরভাবে যুক্ত করছে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ: আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রায় নয়াদিল্লি বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধিকে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে। ভারতীয় কৌশলবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের এই চুক্তি যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি ভারতীয় নিরাপত্তা নীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে—বিশেষত সীমান্তবর্তী আকাশ প্রতিরক্ষায়।
একজন প্রাক্তন ভারতীয় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন,
“জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান হচ্ছে চীনের চতুর্থ প্রজন্মের উন্নত যুদ্ধবিমান। দক্ষিণ এশিয়ায় এর উপস্থিতি কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।”
অর্থনৈতিক প্রশ্ন ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক দেশে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজেট ঘাটতির সময় এমন বড় ক্রয়ের যৌক্তিকতা কতটা? অনেকেই বলছেন, সরকার পরিবর্তনের সময় প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে, সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন,
দেশের বিমানবাহিনী বহু বছর ধরে পুরনো মিগ ও এফ-৭ যুদ্ধবিমানের জায়গায় আধুনিক ফাইটার জেট আনার পরিকল্পনা করে আসছে। জে-১০ সিই ক্রয় সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, মার্কিন পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন—বাংলাদেশ যদি চীনা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশের এই ক্রয়-উদ্যোগ শুধু একটি প্রতিরক্ষা লেনদেন নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির প্রতিফলন যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই এখন কৌশল, প্রভাব ও ভারসাম্যের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
















