রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: আলোচনার টেবিলে সাফল্যের ফুলঝুরি, বাস্তবে ফলাফল শূন্য
আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রাপ্তি কেবল আশ্বাস; নাফ নদ ও সীমান্তজুড়ে আরাকান আর্মির নতুন আতঙ্ক
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও কার্যত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। গত এক বছরে জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনে মেলেনি কোনো কার্যকর সমাধান। উল্টো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত এবং আরাকান আর্মির আগ্রাসী তৎপরতায় বাংলাদেশ সীমান্তে এখন যুদ্ধের কালো ছায়া। নাফ নদে জেলেদের অপহরণ ও নির্যাতন এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে মাদক ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ‘কথার জালে’ বন্দি না থেকে এখন কঠোর ও বাস্তবমুখী কূটনীতির সময় এসেছে।
বাংলাদেশের দুই নিকট প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ইস্যুটি কেবল মানবিক সংকট হিসেবে নয়, বরং এটি এখন মাদক পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আলোচনার টেবিলে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে তুলে ধরেন।
- আন্তর্জাতিক সংলাপ: গত বছর আগস্টে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপে ড. ইউনূস স্পষ্ট বলেছিলেন, “আমরা কেবল কথার জালে বন্দি থাকতে পারি না, সংকটের দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও।”
- সম্মেলনের ফলাফল: কাতার ও নিউ ইয়র্কের সম্মেলনে পশ্চিমা বিশ্ব পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ফলে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভরণপোষণের বিশাল বোঝা এখন এককভাবে বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি: নাফ নদ এখন ‘মৃত্যুফাঁদ’
মিয়ানমারের রাখাইনে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির (AA) মধ্যকার তীব্র সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন সীমান্তে।
- জেলে অপহরণ: নাফ নদে মাছ ধরার সময় বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। কারো ফিরছে নিথর দেহ, কেউ ফিরছেন নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে।
- সীমান্ত অস্থিরতা: নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও উখিয়া সীমান্তে সংঘাতের শব্দে স্থানীয়দের ঘুম হারাম। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই সংঘাত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মাদক ও অপরাধের ‘সফট স্পট’
রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখন মাদক ও সিন্থেটিক ড্রাগ পাচারের নিরাপদ করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
- মাদকের বিস্তার: ইয়াবা ও আইসের মতো মরণনেশা এখন রোহিঙ্গা যুবকদের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। কর্মসংস্থানহীন ও অনিশ্চিত জীবন তাদের অপরাধের অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে।
- সশস্ত্র গোষ্ঠী: শরণার্থী শিবিরে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে সীমান্তের ওপারের যোগাযোগ মাদক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করেছে।
কূটনীতি ও করিডর বিতর্ক
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সরকারের বিশেষ দূত খলিলুর রহমানের ‘আরাকান আর্মিকে করিডর দেওয়ার প্রস্তাব’ দেশে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর বিরোধিতার মুখে সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। বর্তমানে প্রত্যাবাসন নিয়ে বড় কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—কূটনীতি কি তবে ভুল পথে হাঁটছে?
নির্বাচিত সরকার আসার আগে এই সংকট সমাধান না হলে এটি দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।
















