২০২৫ সাল শেষ করেছে রাশিয়া বড় ধরনের প্রাণহানি সত্ত্বেও খুব সামান্য ভূখণ্ড দখল করে। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরে ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ দখল করতে গিয়ে রাশিয়ার চার লাখের বেশি সেনা নিহত ও আহত হয়েছে। কিয়েভের দাবি, বিপুল এই ক্ষয়ক্ষতির পরও মস্কো শান্তি আলোচনায় না গিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে নানা তথ্যযুদ্ধ ও বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়াচ্ছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ অভিযোগ করেন, ইউক্রেন নাকি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভ্যালদাই অঞ্চলের বাসভবনে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে। তিনি দাবি করেন, ৯১টি দীর্ঘপাল্লার ড্রোন রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। তবে ওই সময় পুতিন সেখানে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
ইউক্রেন দ্রুতই এই অভিযোগ অস্বীকার করে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, রাশিয়া কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেনি এবং এমন কোনো হামলাই ঘটেনি। পরে রাশিয়া তুষারের ওপর পড়ে থাকা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করলেও সেগুলোর অবস্থান, উৎস বা সময় নিশ্চিত করা যায়নি। রাশিয়ার ভেতরের বিরোধী গণমাধ্যমগুলোও দাবি করে, স্থানীয় বাসিন্দারা এমন কোনো বিমান প্রতিরক্ষা তৎপরতার শব্দ শোনেননি।
এদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগের ঘোষণার সঙ্গেও ল্যাভরভের বক্তব্যের অসংগতি দেখা যায়। প্রথমে বলা হয়েছিল, নভগোরদ অঞ্চলে ৪১টি ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে। পরে জানানো হয়, আরও ৪৯টি ড্রোন ব্রায়ানস্কে এবং একটি স্মোলেনস্কে ভূপাতিত হয়, যেগুলো নভগোরদের দিকে যাচ্ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এসব এলাকা ভ্যালদাই থেকে বহু দূরে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানায়, কথিত হামলার পক্ষে ইউক্রেনীয় অভিযানের স্বাভাবিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ ইউক্রেনের অন্যান্য সফল হামলার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট প্রমাণ দেখা গেছে।
এই অভিযোগের সময়টি এমন এক পর্যায়ে আসে, যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শেষে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আশাবাদী বার্তা পেয়েছিলেন। এমনকি পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও বলেছিলেন, ২০২৬ সালের শুরুতেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে ল্যাভরভের বক্তব্যের পর সেই আশাবাদে ভাটা পড়ে।
জেলেনস্কি বলেন, শান্তি আলোচনা এড়াতে এবং যুদ্ধ আরও বাড়াতে রাশিয়া অজুহাত খুঁজছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি নস্যাৎ করতেই এ ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
২০২৫ সালে রাশিয়া দাবি করে, তারা ইউক্রেনের ৬ হাজার ৬৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ও ৩৩৪টি বসতি দখল করেছে। তবে আইএসডব্লিউ বলছে, বাস্তবে রাশিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে প্রায় ৪ হাজার ৯৫২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এবং ২৪৫টি বসতিতে। ইউক্রেনের সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দ্র সিরস্কির হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ইউক্রেনের মোট ভূমির মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ হারানো হয়েছে, যার বিনিময়ে রাশিয়ার নিহত ও আহতের সংখ্যা প্রায় চার লাখ ২০ হাজার।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানায়, পুরো যুদ্ধে রাশিয়ার মোট ক্ষয়ক্ষতি ১২ লাখের বেশি সেনা, প্রায় সাড়ে ১১ হাজার ট্যাংক, ২৪ হাজার সাঁজোয়া যান, ৩৭ হাজারের বেশি কামান ব্যবস্থা এবং শত শত বিমান ও হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র।
বছর শেষে এসেও রুশ বাহিনী দোনেৎস্কের পোকরভস্ক ও মিরনোহরাদ দখলে ব্যর্থ হয়। দক্ষিণের জাপোরিঝিয়া অঞ্চলেও দাবি করা সাফল্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের মিল নেই। এমনকি রাশিয়ার সামরিক ব্লগাররাও ভুল তথ্যের কারণে অভিযান ব্যর্থ হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার হামলা অব্যাহত ছিল। বছরের শেষ সপ্তাহে এক হাজারের বেশি ড্রোন ও ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানায়, তারা ৮৬ শতাংশ ড্রোন ও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।
















