বুদবুদভরা এক গ্লাস শ্যাম্পেনের স্বাদ ও ঘ্রাণ উপভোগের পেছনে রয়েছে শত শত বছরের গবেষণা। প্রায় ৩৬০ বছরের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্যাম্পেন পান করার ধরন, গ্লাসের আকৃতি, পরিবেশ এমনকি কখন পান করা হচ্ছে—সবকিছুই স্বাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
একটি গ্লাস শ্যাম্পেনে প্রায় দশ লাখের মতো বুদবুদ থাকতে পারে। এই ক্ষুদ্র বুদবুদগুলোই শ্যাম্পেনের রং, ফেনা, ঘ্রাণ ও স্বাদ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখে। বোতল তৈরির সময় কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ সঠিকভাবে ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বোতল খোলার পর পানকারীর কিছু অভ্যাসও অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করতে পারে।
শ্যাম্পেনের বুদবুদ তৈরি হয় দ্বৈত ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে। দ্বিতীয় ধাপে চিনি ও ইস্ট যোগ করা হলে গাঁজনের ফলে কার্বন ডাই–অক্সাইড তৈরি হয়, যা তরলে আটকে থাকে। বোতল খোলার সঙ্গে সঙ্গে এই গ্যাস বেরিয়ে এসে বুদবুদ তৈরি করে। পরে দীর্ঘ সময় ধরে ‘লিস’-এর ওপর সংরক্ষণের মাধ্যমে শ্যাম্পেনে জটিল ও গভীর স্বাদ গড়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বুদবুদগুলোর আকারও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৩.৪ মিলিমিটার আকারের বুদবুদ সবচেয়ে বেশি ঘ্রাণ ছড়াতে সাহায্য করে। ঠান্ডা শ্যাম্পেনে অ্যালকোহলের তীব্রতা কম অনুভূত হয়, ফলে সূক্ষ্ম স্বাদ আরও স্পষ্ট হয়।
এই বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে শ্যাম্পেন উপভোগের ছয়টি উপায় তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, পরিবেশের গুরুত্ব। গবেষণায় দেখা গেছে, আলো ও সঙ্গীত শ্যাম্পেনের স্বাদ উপলব্ধিতে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সঙ্গীতের প্রভাব বেশি। সঠিক পরিবেশে পান করলে অভিজ্ঞতা অনেক বেশি আনন্দদায়ক হয়।
দ্বিতীয়ত, গ্লাসের নির্বাচন। চওড়া কুপ গ্লাস দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সরু ফ্লুট গ্লাসে শ্যাম্পেনের বুদবুদ ও ঘ্রাণ বেশি সময় ধরে থাকে। ফলে স্বাদও ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।
তৃতীয়ত, গ্লাস প্রস্তুত করা। খুব বেশি ডিটারজেন্ট ব্যবহার করে গ্লাস ধোয়া হলে অবশিষ্ট রাসায়নিক বুদবুদ তৈরিতে বাধা দিতে পারে। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ সাবান ছাড়া গ্লাস ধোয়ার পরামর্শ দেন।
চতুর্থত, ঢালার কৌশল। গ্লাস সামান্য কাত করে ধীরে পাশে দিয়ে ঢাললে কার্বন ডাই–অক্সাইড কম বের হয় এবং ফিজ বেশি সময় থাকে। সোজা গ্লাসে ঢাললে বেশি গ্যাস নষ্ট হয়।
পঞ্চমত, সময়মতো পান করা। দীর্ঘদিন সংরক্ষণে শ্যাম্পেনের কার্বন ডাই–অক্সাইড ধীরে ধীরে কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক দশক পুরোনো বোতলে ফিজ প্রায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বোতল কেনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই পান করাই ভালো।
ষষ্ঠত, উচ্চতার বিষয়টি বিবেচনা করা। বিমানে বা বেশি উচ্চতায় কম চাপ ও আর্দ্রতার কারণে স্বাদ বদলে যেতে পারে। এ অবস্থায় শ্যাম্পেন বেশি টক বা তীব্র লাগতে পারে, তাই তুলনামূলকভাবে শুরুতেই পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, একটি গ্লাস শ্যাম্পেন শুধু বিলাসিতা নয়, বরং রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের এক অনন্য মেলবন্ধন। সঠিক নিয়ম মেনে পান করলে এই শতাব্দীপ্রাচীন পানীয়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ পুরোপুরি উপভোগ করা সম্ভব।
















