বিদ্যুতের চড়া দাম ও বিতর্কিত বিল নিয়ে আদানি গ্রুপকে কড়া চিঠি; তদন্তে দুদক ও চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি
ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। গত সপ্তাহে আদানি গ্রুপকে দেওয়া এক চিঠিতে পিডিবি স্পষ্ট জানিয়েছে, এই চুক্তির বেশিরভাগ শর্ত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং বিদ্যুতের দামও অত্যধিক। ভারতীয় এই শিল্পগোষ্ঠীর সব বিলকে ‘বিরোধপূর্ণ’ উল্লেখ করে পিডিবি জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আদানির কোনো লেনদেনের দায়ভার তারা নেবে না।
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | দুপুর ১২:০০ এএম
শাহেদ সিদ্দিকী | ঢাকা
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকেই আদানির সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের করা এই বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়। এরই ধারাবাহিকতায় জ্বালানি উপদেষ্টা, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বিত সিদ্ধান্তের পর আদানিকে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চুক্তির ফাঁদে বাংলাদেশ: স্বার্থবিরোধী শর্তের পাহাড়
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৬ সালে করা এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, আদানি থেকে বিদ্যুৎ না নিলেও প্রতি মাসে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। এছাড়া কয়লার দাম নির্ধারণ এবং বিলিং প্রক্রিয়ায় আদানির একচেটিয়া আধিপত্য বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কয়লা ও বিদ্যুতের দামে আকাশ-পাতাল পার্থক্য
পিডিবির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভারতের অন্যান্য বেসরকারি কোম্পানি থেকে বাংলাদেশ যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৬০ পয়সায় কিনছে, সেখানে আদানির বিদ্যুতের দাম পড়ছে ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা। কয়লার দামের ক্ষেত্রেও আদানি অন্যান্য কেন্দ্রের চেয়ে বেশি দাম আদায় করছে। প্রতি টন কয়লায় আদানি ৭৬.৯১ ডলার দাবি করছে, যেখানে পায়রা বা মৈত্রী কেন্দ্রে তা অনেক কম।
তদন্তে দুদক ও দায় নিতে অস্বীকৃতি
পিডিবি চিঠিতে জানিয়েছে, আদানির চুক্তি, বিল এবং ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি তদন্ত করছে। এই তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় পিডিবি আদানির কোনো পাওনা বা লেনদেনের আর্থিক গ্যারান্টি দেবে না। বর্তমানে আদানির প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের বিল ‘বিরোধপূর্ণ’ হিসেবে পিডিবির কাছে জমা পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম বলেন, “চুক্তি এবং বিদ্যুতের দাম নিয়ে আদানির সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে চরম বেকায়দায় আছে। সরকারের এই চিঠি দেওয়ার উদ্যোগটি সময়োপযোগী।”
উল্লেখ্য, গত দুই অর্থবছরে আদানির বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে পিডিবির লোকসান হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। আদানির বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কোনো সরকারি ভর্তুকি না থাকায় এই বিপুল লোকসানের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের কাঁধেই পড়বে।
















