বিশ্বজুড়ে ৪০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলেন। এই ভাষার বহু শব্দ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভিন্ন ভিন্ন পথে ইংরেজি ভাষায় ঢুকে আজ নিত্যব্যবহারের অংশ হয়ে গেছে।
বর্তমানে আরবি ভাষাভাষীর সংখ্যা অন্তত ৪০০ মিলিয়ন। এর মধ্যে প্রায় ২০০ মিলিয়ন মানুষ মাতৃভাষা হিসেবে আরবি ব্যবহার করেন এবং আরও ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন মানুষ এটি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। আধুনিক মানক আরবি বা মডার্ন স্ট্যান্ডার্ড আরবি সরকার, আইন ও শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় পরিসরেও এর গুরুত্ব রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে ২৫টির বেশি আরবি উপভাষা প্রচলিত।
প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ বিশ্ব আরবি ভাষা দিবস পালন করে। ১৯৭৩ সালের এই দিনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আরবিকে সংস্থাটির ছয়টি দাপ্তরিক ভাষার একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই দিনটি মানব সভ্যতার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে আরবি ভাষার অবদানকে স্মরণ করার জন্য নির্ধারিত।
এই উপলক্ষে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে আল জাজিরা তুলে ধরেছে এমন কিছু পরিচিত ইংরেজি শব্দের কথা, যেগুলোর উৎস আরবি ভাষা অথবা যেগুলো আরবি হয়ে অন্য ভাষার মাধ্যমে ইংরেজিতে প্রবেশ করেছে।
ভাষাবিদদের মতে, বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণেই বিভিন্ন ভাষায় আরবি শব্দের উপস্থিতি দেখা যায়। সেমিটিক ভাষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত আরবি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা সমাজ ও ভাষাকে প্রভাবিত করেছে। ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, তুর্কিসহ বহু ভাষায় আরবি উৎসের শত শত শব্দ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষার অধ্যাপক ও ভাষাবিদ মুনতাসির আল হামাদ বলেন, ভাষায় শব্দ ধার নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তার ভাষায়, আরবি ভাষাও অন্য ভাষার মতোই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার নানা ক্ষেত্রে শব্দ বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে।
আরবি বর্ণমালায় ২৮টি অক্ষর রয়েছে এবং এই ভাষা ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হয়। শব্দের অবস্থান অনুযায়ী অক্ষরের আকৃতি বদলে যায় এবং সাধারণ লেখায় ছোট স্বরচিহ্ন ব্যবহার করা হয় না। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেকের কাছে আরবি ভাষা কঠিন বলে মনে হলেও অধ্যাপক আল হামাদের মতে, এটি আসলে ভিন্ন কাঠামোর একটি ভাষা মাত্র। উর্দু ও ফারসি ভাষাভাষীদের কাছে আরবি লিপি তুলনামূলকভাবে পরিচিত, আর তুর্কি ভাষাভাষীরা আরবি শব্দভান্ডারের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন।
গণিত ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরবি ভাষার অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বীজগণিত শব্দটি এসেছে আরবি ‘আল-জাবর’ থেকে, যার অর্থ পুনর্গঠন বা সংযোজন। নবম শতাব্দীতে বাগদাদের পণ্ডিত মুহাম্মদ ইবন মুসা আল-খোয়ারিজমির লেখা একটি গ্রন্থের শিরোনাম থেকেই এই শব্দটির প্রচলন ঘটে। তার নাম থেকেই পরে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির উৎপত্তি।
অনেক ক্ষেত্রে আরবি শব্দ ইংরেজিতে আসার সময় উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। মূল্যবান পাথরের ওজন মাপার একক ‘ক্যারেট’ শব্দটির মূল আরবি শব্দ ‘কিরাত’। ইংরেজিতে ‘কিউ’ অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া শব্দ কম থাকায়, এমন শব্দগুলো সময়ের সঙ্গে ‘সি’, ‘জি’ বা ‘কে’ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেন আল হামাদ।
একইভাবে ‘জিরাফ’ শব্দটির উৎস আরবি ‘জারাফা’। ধ্বনিগত সুবিধার জন্য ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে এটি পরিবর্তিত রূপে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
বাণিজ্যের মাধ্যমে আরবি শব্দ অন্য ভাষা হয়ে ইংরেজিতে প্রবেশের উদাহরণও রয়েছে। ‘টারিফ’ বা শুল্ক শব্দটি এসেছে আরবি ‘তা’রিফ’ থেকে, যার অর্থ ঘোষণা করা বা অবহিত করা। ভাষাবিদদের মতে, এসব শব্দ প্রথমে রোমান্স ভাষা এবং তুর্কি ভাষার মধ্য দিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে উপনিবেশিক যুগে ইংরেজি ও আরবি ভাষার মধ্যে সরাসরি শব্দ আদান-প্রদান আরও বৃদ্ধি পায়।
এভাবেই আরবি ভাষা ইতিহাসের নানা স্তরে ছড়িয়ে দিয়ে গেছে তার শব্দভান্ডার, যা আজও ইংরেজিসহ বহু ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
















