পৃথিবীর নীল বুকের বহু নিচে, যেখানে আলো পৌঁছায় না, সেখানে নিঃশব্দে বাস করে হাজারো অজানা প্রাণ। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক বৃহৎ গবেষণায় উঠে এসেছে এক গভীর ক্ষতের কথা—গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলনের পরীক্ষামূলক যন্ত্র সাগরতলের জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খনন যন্ত্রের চাকার দাগে প্রাণীর সংখ্যা কমে গেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। সেই সঙ্গে প্রজাতির বৈচিত্র্যও কমেছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ। প্রশান্ত মহাসাগরের এক দুর্গম অঞ্চলে বিজ্ঞানীরা চার হাজারেরও বেশি প্রাণীর সন্ধান পান, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই বিজ্ঞানের কাছে ছিল একেবারে নতুন প্রজাতি—অচেনা, অজানা, নিঃশব্দ বাসিন্দা।
এই গবেষণা চালায় লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফি সেন্টার এবং সুইডেনের গ্যোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। গবেষণাটি করা হয় এক খনন কোম্পানির অনুরোধে, তবে বিজ্ঞানীরা জানান, তাদের কাজ ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন, কোনো ফলাফল পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না।
দুই বছর আগে ও পরীক্ষামূলক খননের দুই মাস পরের সমুদ্রতল তুলনা করে দেখা হয় ০.৩ মিলিমিটার থেকে ২ সেন্টিমিটার আকারের ক্ষুদ্র প্রাণীদের—যেমন কৃমি, সামুদ্রিক মাকড়সা, ঝিনুক, শামুক। যন্ত্রের চলার পথে প্রাণীর সংখ্যা কমেছে ৩৭ শতাংশ এবং প্রজাতির বৈচিত্র্য কমেছে ৩২ শতাংশ।
গবেষক ইভা স্টুয়ার্ট জানান, যন্ত্রগুলো সমুদ্রতলের ওপরের পাঁচ সেন্টিমিটার স্তর তুলে নেয়। আর ঠিক সেখানেই বাস করে সবচেয়ে বেশি প্রাণ। সেই স্তর তুলে নেওয়া মানেই তাদের ঘরবাড়ি, জীবন, আশ্রয় একসঙ্গে সরিয়ে ফেলা।
এমনকি যারা তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়নি, তাদের অনেকেই খনন থেকে সৃষ্ট দূষণে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন আরেক গবেষক ড. গুয়াদালুপে ব্রিবিয়েস্কা-কনত্রেরাস। কিছু প্রাণ হয়তো সরে যেতে পেরেছে, কিন্তু তারা আদৌ ফিরে আসবে কি না—সে প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে গভীর অন্ধকারে।
তবে যন্ত্রের পাশের এলাকায়, যেখানে শুধু পলি ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে প্রাণীর সংখ্যা খুব একটা কমেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রজাতির আধিপত্য বদলে গেছে, কিন্তু মোট জীবনের পরিমাণ বড়ভাবে নেমে যায়নি।
খনন কোম্পানিটি বলেছে, তারা এই তথ্য দেখে উৎসাহিত, কারণ তাদের দাবি—ক্ষতি মূলত যন্ত্র চলার সরাসরি এলাকাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অনেক স্বাধীন বিশেষজ্ঞের মতে, এই ফলাফল বরং আরও বড় সতর্কবার্তা।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ড. প্যাট্রিক শ্রোডার বলেন, বর্তমান প্রযুক্তি এতটাই বিধ্বংসী যে বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক খনন হলে ক্ষতি আরও ভয়াবহ হবে। পরীক্ষামূলক পর্যায়েই যদি এমন প্রভাব দেখা যায়, তাহলে পুরো সমুদ্রতলে কী ঘটবে, তা কল্পনাও কঠিন।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো—এই গভীর সমুদ্রে লুকিয়ে আছে বিপুল সম্পদ। ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপার্টন জোন নামে পরিচিত এক বিশাল এলাকায় রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন টন নিকেল, কোবাল্ট ও তামাসমৃদ্ধ পলিমেটালিক নডিউল। এই খনিজগুলো আজকের পৃথিবীতে অপরিহার্য—সোলার প্যানেল, উইন্ড টারবাইন, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রাণশক্তি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে এসব খনিজের চাহিদা অন্তত দ্বিগুণ হবে। প্রশ্ন একটাই—এই চাহিদা পূরণের মূল্য কী হবে? সাগরের অজানা জীবনের নিশ্চুপ বিসর্জন?
অনেক দেশ এই খননের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সিবেড অথরিটি এখনও বাণিজ্যিক খননের অনুমতি দেয়নি, তবে অনুসন্ধানের জন্য ৩১টি লাইসেন্স ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ ৩৭টি দেশ এই খননের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার পক্ষে।
নরওয়ে সম্প্রতি আর্কটিক অঞ্চলে খনন পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই খাত দ্রুত এগিয়ে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন, বিশেষ করে অস্ত্র শিল্পে খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে।
গভীর সমুদ্র, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। তার বুকে এই নতুন ক্ষত কতটা গভীর হবে, তা এখনো অজানা।
এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশনে। কিন্তু প্রশ্নটা বৈজ্ঞানিক কাগজের পাতায় থেমে নেই—এ প্রশ্ন এখন সমুদ্রের নীরব অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে: আমরা কি উন্নয়নের নামে ধ্বংসের পথে হাঁটছি?
















