টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবোট রাজ্যে কথিত “শরিয়া আদালত” নিয়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেক্সাসে কোনো শরিয়া আদালত নেই—শুধু স্বেচ্ছাসেবী মুসলিম মধ্যস্থতা পরিষদ আছে, যেগুলো একই আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয় যেমনটি ইহুদি বাথ দিন বা খ্রিস্টান মধ্যস্থতা পরিষদে দেখা যায়।
নভেম্বর ১৯ তারিখে জেলা অ্যাটর্নি ও শেরিফদের উদ্দেশে পাঠানো এক চিঠিতে অ্যাবোট দাবি করেন, “ধর্মীয় ছদ্মবেশে কোনো আদালত রাজ্য বা ফেডারেল আইন এড়াতে পারে না”, যা ইঙ্গিত দেয় মুসলিমরা নাকি গোপনে বিকল্প বিচারব্যবস্থা তৈরি করছে।
এর আগের দিন তিনি মার্কিন মুসলিমদের সবচেয়ে বড় নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR)–কে “বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করেন। কোনো অপরাধ, হুমকি বা প্রমাণ ছাড়াই দেওয়া এই ঘোষণার আইনি ক্ষমতা অ্যাবোটের নেই—এমন সিদ্ধান্ত কেবল ফেডারেল সরকারের।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত মুসলিম সম্প্রদায়কে সন্দেহজনক হিসেবে তুলে ধরার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা, আইন প্রয়োগ নয়।
মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে “শরিয়া আতঙ্ক” সৃষ্টির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ২০০০-এর শেষ ভাগ থেকে কয়েক ডানপন্থী সংগঠন দেশজুড়ে “অ্যান্টি-শরিয়া বিল” প্রচার করে, যার আওতায় ৪০টির বেশি রাজ্যে “বিদেশি আইন নিষিদ্ধকরণ” বিল আনা হয়—যা মূলত ইসলামিক আইনকেই লক্ষ্য করে।
ওকলাহোমায় এমন একটি সংশোধনী পাসও হয়, যা পরে আদালত বাতিল করে দেয়। পরে এসব প্রচারণা মুসলিমদের ধর্মীয় চর্চাকেই নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখানোর পথ তৈরি করে দেয়।
টেক্সাসেই সম্প্রতি একটি মুসলিম নেতৃত্বাধীন রিয়েল এস্টেট প্রকল্পকে “শরিয়া কলোনি” বলে ভুয়া প্রচারণা চালানো হয় এবং বিচার বিভাগ তদন্ত শুরু করে। পরে কোনো অনিয়ম না পাওয়ায় তা বন্ধ করা হয়। তবুও সেপ্টেম্বরে অ্যাবোট “শরিয়া কম্পাউন্ড” নিষিদ্ধ করার আইন সই করেন।
অন্য রাজ্যেও মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। টেনেসিতে একটি মসজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে—“ইসলাম কোনো ধর্ম নয়”—যা সাংবিধানিক ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। মিশিগানের ডিয়ারবনে একাধিকবার ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে শহরটি নাকি “শরিয়া আইনে পরিচালিত”।
মুসলিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও টার্গেট হয়েছেন। নিউ ইয়র্কের মেয়র-ইলেক্ট জোহরান মামদানিকে নিয়ে প্রচার হয় তিনি নাকি “শরিয়া শাসন” আনতে চান, যদিও তার নির্বাচনী নীতিতে ধর্মীয় কোনো বিষয়ই ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রচারণা আইন বা নিরাপত্তা নিয়ে নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রে কারা “আমেরিকান” হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং কারা সন্দেহের চোখে দেখা হবে, সেই নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।
শরিয়া নিয়ে যেসব ধারণা প্রচার করা হয়, তার সঙ্গে ইসলামী আইনের বাস্তব অবস্থার কোনো মিল নেই। ইসলামী ঐতিহ্যে শরিয়া মূলত ন্যায়, কল্যাণ ও মানবমর্যাদা রক্ষার নৈতিক কাঠামো। এর লক্ষ্য জীবনের সুরক্ষা, সম্পদের নিরাপত্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
এমনকি পশ্চিমা আইনি কাঠামোর সঙ্গে ইসলামী আইনের বহু ঐতিহাসিক সাদৃশ্য রয়েছে বলেও গবেষকরা উল্লেখ করেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াকে ঘিরে আতঙ্ক বাড়ছে মুসলিমদের নাগরিক জীবনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং কমিউনিটি সংগঠনের প্রসারের কারণে। দেশটিতে বৈচিত্র্যবিরোধী বক্তব্য ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত বিপদ শরিয়া নয়—বরং সেই রাজনৈতিক যন্ত্র, যা সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের সন্দেহের চোখে দেখার পরিবেশ তৈরি করছে এবং তাদেরকে অপ্রয়োজনীয় নজরদারি ও বৈষম্যের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
















