কৌশল পাল্টে নতুন নেটওয়ার্ক গড়ার চেষ্টা করছে ইসকন, গোয়েন্দা নজরদারি
বিতর্কিত ও উগ্র ধর্মীয় সংগঠন ইসকন (International Society for Krishna Consciousness) তাদের সরাসরি কার্যক্রমের কৌশল পাল্টে দেশে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ইসকন এখন পূজা উদযাপন পরিষদ, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, রামসেনা, শিবসেনা সহ বিভিন্ন প্রধান ও নামসর্বস্ব ধর্মীয় সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব দখল করে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এই নেটওয়ার্কিং-এ সহায়তা করছেন ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কিছু নেতা, যারা গোপন বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছেন।
ইসকনের নতুন কৌশল ও সমন্বয় কেন্দ্র
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইসকনের নতুন কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো চট্টগ্রামের প্রবর্তক ইসকন মন্দিরের আন্ডারগ্রাউন্ড অংশ, যেখানে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত নেতারা নিয়মিত বৈঠক করছেন।
- পলাতক নেতাদের নির্দেশনা: বিশেষ করে ভারতের কলকাতা ও ত্রিপুরায় আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন প্রভাবশালী ইসকন নেতা এই বৈঠকগুলোতে নির্দেশনা দিচ্ছেন।
- ছদ্মবেশে তৎপরতা: ইসকনের কর্মীরা নিজেদের আসল গেরুয়া পোশাক ত্যাগ করে সাধারণ ভক্তের বেশে ধর্মীয় উৎসব-আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন, যাতে স্থানীয়ভাবে সন্দেহের মধ্যে পড়তে না হয়।
- নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি: ইতোমধ্যে অন্তত ১৩টি সংগঠনের নামে এক হাজারেরও বেশি কমিটি দেশজুড়ে গঠন করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই অপচেষ্টা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সংখ্যালঘু ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও ফেব্রুয়ারির ঘটনা
জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতনের পর, ইসকন ছিল সেই কয়েকটি সংগঠনের মধ্যে অন্যতম, যার কাঁধে ভর করে ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশে ফেরার চেষ্টা করে।
- মহাসমাবেশ: পতনের এক মাসের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৬টি মহাসমাবেশ করে ইসকন, যেখানে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
- আন্তর্জাতিক বিভ্রান্তি: এসব সমাবেশ থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ নানা ‘বায়বীয়’ অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক মহলে হাসিনার পতনকে মৌলবাদের উত্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়।
- সীতাকুণ্ডে প্রথম ধরা: গত ফেব্রুয়ারিতে সীতাকুণ্ডের শিব চতুর্দশী মেলায় রামসেনাসহ তিনটি সংগঠনের ব্যানারে একই ধরনের টি-শার্ট পরা শতাধিক তরুণের আচরণে ইসকনের নতুন কৌশল প্রথম গোয়েন্দাদের নজরে আসে।
- চিন্ময়ের মুক্তি চাই: জন্মাষ্টমীর র্যালিতে চিন্ময়ের মুক্তি চাই লেখা প্লাকার্ড প্রদর্শন করে রাম সেনার সদস্যরা, যা ইসকনের প্রভাবকে স্পষ্ট করে।
চিন্ময় ও আইনজীবী হত্যা মামলা
আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ইসকন নেতা চন্দন ধর ওরফে চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ সনাতনী জাগরণী জোটের ব্যানারে অবাস্তব দাবি-দাওয়া তুলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করেন।
- রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: জাতীয় পতাকার ওপর গেরুয়া পতাকা প্রতিস্থাপন করায় চিন্ময় দাশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
- নৃশংস হত্যা: গ্রেপ্তারের পর আদালতের ওপর চড়াও হয়ে ইসকনের সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে পিটিয়ে ও জবাই করে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
- সামাজিক প্রতিরোধ: এই ঘটনার পর ইসকনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
ইসকন-আওয়ামী লীগ সমন্বিত নেটওয়ার্ক
সামাজিক প্রতিরোধের কারণে ইসকন এখন সরাসরি কার্যক্রম না চালিয়ে তাদের সদস্যদের নিম্নলিখিত নামসর্বস্ব সংগঠনগুলোতে ছড়িয়ে দিচ্ছে:
- সংগঠনসমূহ: রামসেনা, হিন্দুস্তান পরিবার, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট, হিন্দু ছাত্র পরিষদ, জাগো হিন্দু পরিষদ, বিশ্ব সনাতন মোর্চা, সনাতনী জাগরণ জোট ইত্যাদি।
- নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ: এসব সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা, যাদের অনেকেই ইসকনের ঘনিষ্ঠ বা প্রত্যক্ষ সদস্য।
সমন্বয়কারী ও পৃষ্ঠপোষক
পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করছেন প্রবর্তক ইসকন মন্দিরের চিন্ময়পন্থি নেতারা, যেমন উজ্জ্বল মল্লিক, জুয়েল আইস, অজয় দত্ত প্রমুখ।
আওয়ামী লীগের পক্ষে সমন্বয় করছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, পুলক খাস্তগীর, জহরলাল হাজারী প্রমুখ। এই গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন পলাতক শিক্ষামন্ত্রী স্বঘোষিত ইসকন সদস্য মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন অফিস এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে।
জন্মাষ্টমী পরিষদে প্রভাব
চট্টগ্রামের জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদে ইসকন ও আওয়ামী লীগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এই সংগঠনের কমিটির সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে প্রবর্তক ইসকন মন্দিরের আন্ডারগ্রাউন্ডে গোপন বৈঠক করেন।
- সভাপতির নেতৃত্ব: কমিটির সভাপতি চন্দন কুমার ২৫ নভেম্বর আলিফ হত্যাকাণ্ডের সময় ইসকন সন্ত্রাসীদের নেতৃত্ব দেন এবং জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি ইসকনের সক্রিয় নেতা।
- নেতৃত্বের প্রোফাইল: কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব পার্থ একসময় আ জ ম নাছির উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অন্যান্য পদাধিকারীদের (রতন আচার্য, অশোক দত্ত, নিখিল নাথ) অধিকাংশই একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ/যুবলীগ/ছাত্রলীগ ও ইসকনের সদস্য।
ভারতীয় উগ্রবাদী সংগঠনের ঘনিষ্ঠতা
গোয়েন্দা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ধর্মীয় সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে থাকা অনেক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে ভারতের উগ্রবাদী রাজনৈতিক দল বিজেপি ও সশস্ত্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
- জন্মাষ্টমী পরিষদের একাধিক নেতা নিয়মিতভাবে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম সফর করে আরএসএস ও বিজেপির আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এসব ধর্মীয় সংগঠনের কমিটিতে কারা রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিএমপি জনসংযোগ কর্মকর্তা অনিন্দিতা বড়ুয়া। তিনি বলেন, “কেউ যদি ধর্মীয় আবরণের আড়ালে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে।”
















