গ্রাম-ইউনিয়নে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় শহরের পাম্পে উপচে পড়া ভিড়; কৃত্রিম সংকটে ভোগান্তি
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর অবৈধ মজুত ঠেকানো ও অপচয় রোধে নেওয়া কঠোর নির্দেশনার প্রভাবে ভেঙে পড়েছে দেশের কয়েক দশকের পুরনো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন)। বিশেষ করে বরিশাল বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে ‘প্যাক পয়েন্ট’ ও ‘সাব-ডিলার’ প্রথা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ জনপদে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে গ্রামের সেচযন্ত্র ও যানবাহন মালিকরা শহরের পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, দেশে তেল সরবরাহের চিরাচরিত তিনটি ধাপের মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ের ধাপটি এখন অচল। ফলে হাত বাড়ালেই যেখানে তেল মিলত, এখন সেখানে ৩০-৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
সাপ্লাই চেইন যেভাবে ভেঙে পড়ল:
- সাব-ডিলার ও প্যাক পয়েন্টে খড়গ: প্যাক পয়েন্ট ডিলাররা মূলত ড্রামে করে তেল নিয়ে গ্রাম্য হাটে বিক্রি করতেন। আবার তাদের কাছ থেকে তেল নিয়ে ‘সাব-ডিলার’ বা ‘স্লিপ সিস্টেম সেলার’রা ক্ষুদ্র পরিসরে জ্বালানি বিক্রি করতেন। যুদ্ধের পর পাম্প থেকে ড্রামে তেল নেওয়া নিষিদ্ধ করা এবং সরবরাহে কোটা (সিলিং) নির্ধারণ করায় এই চেইনটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
- অবৈধ মজুত বনাম জীবনযাত্রা: গ্রাম পর্যায়ে যারা লাইসেন্স ছাড়াই তেল বিক্রি করতেন, সরকারের অভিযানে তাদের মজুতকে ‘অবৈধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে আইনি জটিলতা এড়াতে অনেক সাব-ডিলার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ নদীবেষ্টিত বা দুর্গম অনেক উপজেলায় কোনো নিবন্ধিত পেট্রোল পাম্পই নেই।
- বিপিসির নতুন নিয়ম: ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ সীমিত করার ফলে প্যাক পয়েন্ট ডিলাররা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। বরগুনার পাথরঘাটা ও ভোলার চরফ্যাশনের মতো এলাকাগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
মাঠপর্যায়ের চিত্র:
- হিজলা ও নলছিটি: বরিশালের হিজলা বা ঝালকাঠির নলছিটির মতো এলাকায় ছোট দোকানগুলোতে এখন আর তেল মিলছে না। হিজলার বাসিন্দারা জানান, আগে বাড়ির পাশেই তেল পাওয়া যেত, এখন বরিশাল শহর থেকে লিটার প্রতি ৪০-৫০ টাকা বেশি দিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে।
- শহরের পাম্পে ভিড়: গ্রামের বাইকার ও কৃষকরা পাম্পে ভিড় করায় লাইনের দৈর্ঘ্য কয়েক গুণ বেড়েছে। পাম্প মালিকদের মতে, গ্রামগুলো তেলশূন্য না হলে শহরের ওপর এই বাড়তি চাপ তৈরি হতো না।
কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: যমুনা ও মেঘনা অয়েল কোম্পানির কর্মকর্তারা নিরাপত্তার স্বার্থে লাইসেন্সবিহীন বিক্রির বিরোধিতাই করছেন। তাদের মতে, পেট্রোলিয়াম পণ্য বিস্ফোরক দ্রব্য হওয়ায় তা যত্রতত্র বিক্রি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তারা স্বীকার করেছেন যে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে প্যাক পয়েন্ট ডিলারশিপ বাড়ানোর মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
















