বড় ধরনের দুর্যোগ না ঘটা, মূল্যস্ফীতির হ্রাস এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ার পরও দেড় কোটির বেশি মানুষ ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার’ মধ্যে ছিল।
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোটের প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৬’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট ও অপুষ্টির হার বর্তমানে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের যে ১০টি দেশে তীব্র ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেই তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বের তীব্র খাদ্য সংকটের দুই-তৃতীয়াংশই মাত্র ১০টি দেশে ঘনীভূত। এই তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন। গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষুধার শিকার মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
২০২৫ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান:
২৬ কোটির বেশি আক্রান্ত: বিশ্বের ৪৭টি দেশে প্রায় ২৬ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার শিকার, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বিপর্যয়কর অপুষ্টি: কেবল ২০২৫ সালেই বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশু অপুষ্টির শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১ কোটি শিশু মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
দ্বৈত দুর্ভিক্ষ: ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই বছরে দুটি ভিন্ন স্থানে (গাজা ও সুদান) দুর্ভিক্ষ বা ‘ফ্যামিন’ শনাক্ত করা হয়েছে।
সংকটের কারণ ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে এই খাদ্য সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় আকারের শরণার্থী (রোহিঙ্গা) জনসংখ্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা খাদ্য বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনটিতে একটি বড় উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে—খাদ্য সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তহবিলের অভাবে এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রবেশাধিকার না থাকায় অনেক দেশের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে প্রকৃত ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই প্রতিবেদনকে বিশ্ব নেতাদের জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ক্ষুধার এই কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
২০২৬ সালেও বিশ্বজুড়ে খাদ্যের এই হাহাকার কমার লক্ষণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রাণ নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া এই চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
















