এক মাসের মাথায় রাষ্ট্র সংস্কারের মুখে সুপরিকল্পিত ‘পুশব্যাক’-এর আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের; মহাসড়কে লক্কড়ঝক্কড় বাসের কৃত্রিম জট ও রহস্যময় নিষ্ক্রিয়তা
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের মিছিলে এবারও যোগ হয়েছে ভোগান্তি, দীর্ঘ যানজট আর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল। তবে মাত্র এক মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারের রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে এই চরম নৈরাজ্যকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে মানতে নারাজ বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ। অভিযোগ উঠেছে, দশকের পর দশক ধরে পরিবহন খাতে জেঁকে বসা শক্তিশালী মাফিয়া চক্র ও সিন্ডিকেট তাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত লাগায় সুপরিকল্পিতভাবে এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং চাঁদাবাজি বন্ধের কঠোর নির্দেশনার বিপরীতে মহাসড়কগুলোতে হঠাৎ হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস নামিয়ে দিয়ে কৃত্রিম যানজট ও ঝুঁকি তৈরির মাধ্যমে নতুন প্রশাসনকে জনসমক্ষে ব্যর্থ প্রমাণের একটি ‘ব্লু-প্রিন্ট’ কার্যকর করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন জনমনে প্রবল।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চার সপ্তাহের একটি নবীন সরকারের পক্ষে দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত বিআরটিএ ব্যবস্থাকে রাতারাতি বদলে ফেলা অসম্ভব। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের (এআরআই) একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ কাঠামোগত ত্রুটি ও চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, যা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখনই কোনো নতুন শক্তি পুরোনো ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমে আঘাত করে, তখন সেই সিস্টেমের সুবিধাভোগীরা পাল্টা আঘাত বা ‘পুশব্যাক’ করে।
এবারের ঈদযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের রহস্যময় নিষ্ক্রিয়তা এবং অসাধু কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা মূলত সেই সিন্ডিকেটেরই একটি চাল হতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সরকারকে একটি নেতিবাচক বার্তা দেওয়া যায়।
তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও সরকারের সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। অতীতের মতো ‘সব ঠিক আছে’ বলে বাগাড়ম্বর না করে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা সরাসরি মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়েছেন। চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং দুর্ঘটনা রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে ঘাপটি মেরে থাকা অসাধু চক্রের কারণে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসেনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বজন হারানো পরিবারের কান্নাকে পুঁজি করে যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে, তাদের চক্রান্ত বুঝতে হবে। একটি নিরাপদ ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার যে রূপরেখা নিয়ে এগোচ্ছে, তা বাস্তবায়নে সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন। আবেগের বশবর্তী না হয়ে সিন্ডিকেটের এই সুপরিকল্পিত বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সচেতনতা বজায় রাখাই এখন সময়ের দাবি।
















