ওমানের মাসকাটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনায় কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। তবে দুই পক্ষ আবারও আলোচনায় বসতে সম্মত হওয়ায় কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ নতুন করে খুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা আপাতত উত্তেজনা কমিয়ে সময় কিনেছে, কিন্তু সমাধানের ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।
৬ ফেব্রুয়ারি কয়েক ঘণ্টার আলোচনার পর প্রকাশ্যে কোনো পক্ষই তাদের অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দেয়নি। ইরান চেয়েছে আলোচনা কেবল পারমাণবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকুক। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে একটি বিস্তৃত কাঠামো, যেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মানবাধিকারসহ একাধিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে পারেনি। তবে আবার বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই বৈঠকটি ছিল ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরাসরি কূটনৈতিক উদ্যোগ। ওই হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল বলে ইরানের দাবি। একই স্থানে আবার আলোচনায় বসা এবং ভবিষ্যৎ বৈঠকে সম্মত হওয়াকে তাই তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
তবে ধারাবাহিকতা মানেই অগ্রগতি নয়। বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর চুক্তির জন্য যে দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে, মাসকাটের আলোচনা তার কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।
এই দফার আলোচনার সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক ছিল আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। মার্কিন প্রতিনিধি দলে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। আলোচনার সময় আরব সাগরে অবস্থান করছিল একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী বহর। কয়েক দিন আগেই ওই বহরের কাছে আসা একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়।
ইরানের কূটনৈতিক সূত্রগুলো এটিকে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, সামরিক হুমকির ছায়ায় পরিচালিত আলোচনা আস্থা তৈরি করে না, বরং কৌশলগত ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটন এটিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার পর মন্তব্য করেন, ইরান চুক্তি চায় এবং চুক্তি না হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে।
বিশ্বাসের ঘাটতি এই আলোচনার সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ইরানের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ইরানও ধাপে ধাপে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস গভীর হয়েছে।
মাসকাট আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানের তেল পরিবহন নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ইরানের দৃষ্টিতে এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনা করছে, অন্যদিকে চাপ বাড়াচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রকাশ্যে বলেছেন, এই অবিশ্বাসই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা।
আলোচনায় ইরান ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের একটি কড়া দাবি ছিল। বরং ইউরেনিয়ামের মজুত কমানো নিয়ে কারিগরি আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি মিসর, তুরস্ক ও কাতার একটি প্রস্তাব দিয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়, যেখানে সাময়িকভাবে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সংযমের কথা বলা হয়। ইরান এসব প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য মনে করেনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ। এর আগে ইরান মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনায় অনড় ছিল। সরাসরি কথোপকথনে রাজি হওয়াকে বিশ্লেষকরা বাস্তবতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই আলোচনা মূলত ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও কারিগরি আলোচনার উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্যই ছিল।
আগামী কয়েক সপ্তাহই ঠিক করবে এই প্রক্রিয়া কোথায় যাবে। আলোচনার পরিধি নিয়ে বিরোধ, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অবস্থান, সামরিক উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা এবং আড়ালের কূটনৈতিক তৎপরতা—এই সবকিছুই নির্ধারণ করবে আলোচনার ভবিষ্যৎ।
বর্তমানে সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো একটি নিয়ন্ত্রিত অচলাবস্থা। এতে যুদ্ধও হবে না, আবার চুক্তিও হবে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা চায় না, কিন্তু তারা শর্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না।
মাসকাটের আলোচনা ব্যর্থ হয়নি, আবার সফলও হয়নি। এটি দেখিয়েছে যে যোগাযোগের একটি চ্যানেল খোলা আছে। তবে চ্যানেল থাকলেই পরিকল্পনা হয় না। যুদ্ধ না হওয়া মানেই শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়। পরবর্তী বৈঠক হয়তো চুক্তি আনবে না, কিন্তু এটি স্পষ্ট করবে—দুই পক্ষ কি সংঘাতের নিচে একটি নিরাপদ ভিত্তি গড়ে তুলছে, নাকি কেবল পতনকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
















