জিম্বাবুয়েতে ক্রমেই বেশি মানুষ চিকিৎসা বিমার বদলে শেষকৃত্য বিমা বেছে নিচ্ছেন। উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং দারিদ্র্যের চাপে টিকে থাকার প্রস্তুতির চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিদায়ের নিশ্চয়তাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
হারারার নিম্নআয়ের এলাকা কাম্বুজুমার বাসিন্দা ষাট বছর বয়সী স্টুয়ার্ড গান্ডা জীবনের শেষ কয়েক মাস ঘরে শয্যাশায়ী অবস্থায় কাটান। পায়ের তীব্র ব্যথায় তিনি চলাফেরা করতে পারতেন না এবং ছোট দোকান চালানোও বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা বিমা না থাকায় এবং হাসপাতালের খরচ বহন করতে না পেরে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি। পরে পরিবারের চেষ্টায় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি জোগাড় করতে না পারায় চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়নি। এক মাসের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
তবে মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে কোনো ঘাটতি ছিল না। কফিন, শববাহী গাড়ি, দাফনের সরঞ্জাম এবং দূরবর্তী গ্রামে যাতায়াতের জন্য বাস—সবই প্রস্তুত ছিল। কারণ তিনি নিয়মিত একটি শেষকৃত্য বিমা প্রতিষ্ঠানে মাসিক সামান্য অর্থ পরিশোধ করতেন। অথচ মাসে প্রায় দুইশ ডলার খরচের চিকিৎসা বিমা তার নাগালের বাইরে ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গান্ডার ঘটনা ব্যতিক্রম নয়। পরিসংখ্যান বলছে, জিম্বাবুয়েতে বিমার আওতায় থাকা মানুষের মধ্যে শেষকৃত্য বিমার হার চিকিৎসা বিমার তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বিমার বাইরে এবং চিকিৎসা ব্যয় নিজ খরচে বহন করতে বাধ্য। আনুষ্ঠানিক চাকরিতে থাকা মানুষের সংখ্যা নয় লাখেরও কম হওয়ায় অধিকাংশেরই বিমা সুবিধা নেই।
একই সময়ে শেষকৃত্য বিমা তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সহজলভ্য। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাসিক এক ডলারেরও কম অর্থে এই বিমা করা যায়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের কাছে এটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠেছে। সমাজে মৃত্যুর পর মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় শেষকৃত্য বিমার প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ফি তুলনামূলক কম হলেও হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোর সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং চিকিৎসক স্বল্পতার কারণে সেবার মান খুবই দুর্বল। অন্যদিকে বেসরকারি চিকিৎসা বিমার প্রিমিয়াম অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। দেশে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ দৈনিক খুব অল্প আয়ে জীবনযাপন করেন, ফলে চিকিৎসা বিমাকে তারা বিলাসিতা হিসেবেই দেখেন।
এক চিকিৎসক জানান, জিম্বাবুয়ের সংস্কৃতিতে মৃত্যুর পরের জীবন ও বিদায়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিপরীতে অসুস্থতা নিয়ে আগেভাগে ভাবাকে অনেকেই অশুভ মনে করেন। ফলে চিকিৎসা বিমার প্রতি আগ্রহ কম থাকে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরতার অভ্যাসও এই মানসিকতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সরকার স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ ঋণ এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে এই কর্মসূচির টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে শেষকৃত্য বিমা খাত দ্রুত বাড়ছে। জীবন বিমা থেকে আসা মোট আয়ের বড় অংশই এখন শেষকৃত্য বিমা থেকে আসছে। শহরভেদে একটি শেষকৃত্যের খরচ কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হওয়ায় এই বিমাকে অনেকেই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
তবে কেউ কেউ এই প্রবণতাকে জীবনের বাণিজ্যিকীকরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আগে সমাজ ও প্রতিবেশীরাই শেষকৃত্যের দায়িত্ব নিত, এখন তা পুরোপুরি অর্থনির্ভর হয়ে গেছে। তবুও যারা আনুষ্ঠানিক বিমা করতে পারেন না, তারা গ্রামভিত্তিক ও পাড়াভিত্তিক সমবায় বা সঞ্চয় গোষ্ঠীর মাধ্যমে শেষকৃত্যের খরচ জোগাড়ের পথ বেছে নিচ্ছেন।
গ্রামাঞ্চলে এমন গোষ্ঠীগুলো শুধু দাফনের খরচ নয়, শোকাহত পরিবারের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীও জোগান দিচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বিমা নিয়েও সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, এখন এমন এক সময় এসেছে যখন স্বাস্থ্য আর বিনা মূল্যে পাওয়া যায় না, তাই জীবনের পাশাপাশি বাঁচার প্রস্তুতিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
















