দীর্ঘ আঠারো মাস বন্ধ থাকার পর গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে সীমান্ত খুললেও ফেরা ফিলিস্তিনিদের চলাচলে নতুন করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। রাফাহ ক্রসিংয়ের বাইরে, ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সেনাবাহিনী একটি নতুন চেকপোস্ট স্থাপন করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘রেগাভিম’। বিশ্লেষকদের মতে, এই নামকরণ কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং এতে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বার্তা লুকানো রয়েছে।
সোমবার সীমান্ত দিয়ে অল্প কয়েকজন মানুষের যাতায়াত শুরু হলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নথিতে দেখা যায়, এটি আর কেবল একটি সীমান্ত পারাপারের স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। বরং এটিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে এই স্থাপনাকে ‘রেগাভিম পরিদর্শন নেকেজ’ নামে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘রেগাভিম’ ও ‘নেকেজ’ শব্দ দুটি বাছাই করা হয়েছে সচেতনভাবেই। এগুলো ইসরায়েলের নিরাপত্তা ভাষার আড়ালে রাজনৈতিক ও আদর্শিক ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্লেষক মোহান্নাদ মুস্তাফার মতে, ‘রেগাভিম’ শব্দটি হিব্রু ভাষায় মাটির ঢেলা বা আবাদযোগ্য জমির অংশ বোঝায়। তবে এটি শুধু একটি শব্দ নয়, বরং জায়নবাদী ইতিহাস ও ভূমি ‘উদ্ধার’-এর স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই শব্দটি একটি পুরোনো জায়নবাদী কবিতা ও শিশুতোষ গানের অংশ, যেখানে ধাপে ধাপে জমি দখলের মাধ্যমে জাতির ভূমি পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।
মুস্তাফার ভাষায়, রাফাহ করিডরের নাম ‘রেগাভিম’ রাখার মাধ্যমে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে গাজায় তাদের উপস্থিতি সাময়িক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়; বরং ভূমির ওপর স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
এ ছাড়া ‘রেগাভিম’ নামটি একটি কট্টর ডানপন্থী সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত, যা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জমি ও স্থাপনা নজরদারি ও ধ্বংসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নাম ব্যবহার করে গাজার ক্ষেত্রেও পশ্চিম তীরের মতো বেসামরিক প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণের মডেল প্রয়োগের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।
আরেক বিশ্লেষক ইহাব জাবারিন মনে করেন, ‘রেগাভিম’ এখন কেবল শব্দ নয়, বরং বসতি সম্প্রসারণপন্থী রাজনীতির একটি ‘ব্র্যান্ড’। তবে তাঁর মতে, আরও উদ্বেগজনক শব্দটি হলো ‘নেকেজ’। এটি মূলত পানি নিষ্কাশন বা নিকাশির পরিভাষা, যা প্রকৌশল ব্যবস্থায় তরল পদার্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়।
জাবারিন বলেন, একটি মানবিক সীমান্ত পারাপারকে ‘নেকেজ’ বলা মানে মানুষকে আর নাগরিক হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি প্রবাহ বা ভর হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়—মানুষের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার, রাজনৈতিক আলোচনা বা সার্বভৌমত্বের ধারণা বাতিল এবং অধিকার নয়, কেবল প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ।
দুই বিশ্লেষকের মতে, এই শব্দচয়ন ইঙ্গিত দেয় যে গাজা এখন না পুরোপুরি দখলমুক্ত, না আনুষ্ঠানিকভাবে দখলকৃত অঞ্চল। বরং এটি একটি ‘নীরব নিয়ন্ত্রণ’-এর কাঠামো, যেখানে ভূমিকে ধরে রাখা হবে এবং মানুষকে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রবেশ বা প্রস্থান করতে দেওয়া হবে।
মুস্তাফার ভাষায়, ‘রেগাভিম’ নাম বসতি স্থাপনকারীদের জন্য বার্তা দেয় যে তারা আবার ভূমিতে ফিরে এসেছে। আর ‘নেকেজ’ নাম নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জানায়, মানুষের চলাচলের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে।















