জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্যাথলিক তীর্থযাত্রা আয়োজন ঘিরে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্বাসী এই ধর্মীয় সমাবেশে অংশ নেওয়া নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন।
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম শুক্রবার গাজীপুর জেলার সেন্ট নিকোলাস প্যারিশে সেন্ট অ্যান্টনির বার্ষিক তীর্থযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এবার তীর্থযাত্রার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ৬ ফেব্রুয়ারি, যা ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগেই।
এই সময়সূচি নিয়ে ক্যাথলিকদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। তবে চার্চ কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।
দিনাজপুর ডায়োসিসের ক্যাথলিক মিণ্টু বিশ্বাস বলেন, প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ এই তীর্থযাত্রায় অংশ নেন, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট উভয়ই। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ নির্বাচন একেবারে সামনে।
তিনি জানান, প্রতিবছর পরিবার নিয়ে তীর্থযাত্রায় গেলেও এবার তিনি যাচ্ছেন না। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রায়ই ব্যবহার করে, ফলে মনে ভয় কাজ করছে।
সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলো এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকায় সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রাল এবং সেন্ট জোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ডিসেম্বর মাসে একটি মুসলিম গোষ্ঠী দুইটি খ্যাতনামা ক্যাথলিক কলেজে হুমকিপত্র পাঠিয়ে চার্চ ও মিশনারি প্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি দেয়।
বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা বৃদ্ধি পায়। ওই আন্দোলনের মুখে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মুহাম্মদ ইউনূসর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
তীর্থযাত্রা আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, গত বছর প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ এই ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন এবং এবারও প্রায় একই সংখ্যক তীর্থযাত্রী আসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চার্চ কর্তৃপক্ষ গাজীপুর জেলা প্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চিঠি দিয়ে তীর্থযাত্রা সম্পর্কে অবহিত করেছে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অনুরোধ জানিয়েছে। ঢাকার একটি আর্চডায়োসিসের জ্যেষ্ঠ যাজক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগ নেই। সরকারকে জানানো হলেও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, সরকার নিরাপত্তা না দিলে চার্চের স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
ঢাকায় কর্মরত প্রোটেস্ট্যান্ট বিশ্বাসী অবিনাশ সোরেন বলেন, সেন্ট অ্যান্টনির তীর্থযাত্রা বাংলাদেশের খ্রিস্টানদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজন। তাই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তিনি জানান, পরিবারসহ তীর্থযাত্রায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রত্যাশা করছেন।
এদিকে তীর্থযাত্রা এলাকার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানিয়েছেন, ২৮ জানুয়ারি তিনি চার্চ কর্তৃপক্ষের চিঠি পেয়েছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
















