ভারতে চলমান বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক জুরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুত ও বিশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালার নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
গত ২০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে আয়োজিত সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার রক্ষা বিষয়ক এক জাতীয় সম্মেলনে বিভিন্ন রাজ্যের নাগরিকেরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। এই সম্মেলনের আয়োজন করে ভারত জোড়ো অভিযান, পিইউসিএল ও এনএপিএম। সেখানে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, গুজরাট, তামিলনাড়ু, গোয়া ও উত্তর প্রদেশের মানুষের বক্তব্য শোনা হয়।
নির্বাচন কমিশনের বুথ লেভেল কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত সংশোধন প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা উঠে আসে এসব সাক্ষ্যে। বিভিন্ন রাজ্যে এই কাজের চাপের কারণে কর্মকর্তাদের আত্মহত্যার ঘটনা, শিক্ষকদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব চাপানো এবং জেলা প্রশাসনের উদাসীনতা প্রক্রিয়াটিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে হঠাৎ নথিপত্র চাওয়া, তথ্যের অমিল এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
জুরি বোর্ডের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নথিপত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ২০০৩ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে সংযোগ খোঁজার ফলে অভিবাসী, দরিদ্র ও গৃহহীন মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনুপস্থিতি, ধর্ম, পরিচয়, জীবনযাত্রার মান, বয়স ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যের অভিযোগও উঠেছে, যার কারণে বহু প্রান্তিক মানুষ তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন।
অভিবাসীদের ক্ষেত্রে রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে দেখা গেছে, কাজের প্রয়োজনে অন্য রাজ্যে অবস্থান করায় অনেক কৃষিশ্রমিক যাচাইয়ের সময় বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের বিধান অনুযায়ী তাঁরা যোগ্য হলেও তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলে সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত বহু মানুষ নিবন্ধন ফরম পাননি। ধ্বংস হওয়া গ্রাম ও হারিয়ে যাওয়া নথির কারণে সেখানে বিপুলসংখ্যক ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ধর্ম ও পরিচয়ের প্রশ্নে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে মুসলিম ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক এলাকায় বসতি উচ্ছেদের পর বাসিন্দাদের অবৈধ বলে চিহ্নিত করে তাঁদের ভোটার তালিকায় রাখা হচ্ছে না। একইভাবে তামিলনাড়ুর বনাঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত আদিবাসীরাও এই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ছেন। মধ্যপ্রদেশের কিছু এলাকায় ভাসমান ভোটারদের বিদেশি আখ্যা দিয়ে তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়ার হুমকির কথাও উঠে এসেছে।
মহানগর এলাকার বস্তিবাসীরাও এই সংশোধনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একাধিক শহরে করা গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত এলাকায় ভোটার নিবন্ধনের হার তুলনামূলক বেশি হলেও বস্তি এলাকায় তা অনেক কম। এর ফলে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
কিছু রাজ্যে জীবিত মানুষকে ভুলবশত মৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ঘটনাও সামনে এসেছে। এতে শুধু ভোটাধিকার নয়, সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাও হারাচ্ছেন অনেকে। একই সঙ্গে নারী ও ট্রান্সজেন্ডার ভোটারদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিয়ের পর বসবাসের স্থান বদলানো নারীরা যাচাইযোগ্য আত্মীয়ের অভাবে সমস্যায় পড়ছেন, আর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ট্রান্সজেন্ডাররা আবাসন সংকটের কারণে তালিকায় স্থান পাচ্ছেন না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির নাম বাদ পড়লে তাঁর সন্তানদের নামও ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে। নাম ও ভোটার নম্বরে সামান্য ভুল থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নজির রয়েছে। অন্যদিকে বুথ লেভেল কর্মকর্তারা চরম মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠলেও নির্বাচন কমিশন সেই বিষয়টি স্বীকার করছে না।
সবশেষে জুরি বোর্ড সতর্ক করেছে, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই ভোটার তালিকার সঙ্গে আধার তথ্য যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে নজরদারি ও হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এতে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
















