বাংলাদেশে বিগত এক বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া ৬৪৫টি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টিতে সাম্প্রদায়িক উপাদানের উপস্থিতি পেয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। পুলিশ সদর দপ্তরের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানানো হয়েছে, বাকি ৫৭৪টি ঘটনা মূলত জমি সংক্রান্ত বিরোধ, চুরি ও ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো সাধারণ অপরাধ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুজব প্রতিরোধ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশে বিগত এক বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে সংঘটিত বিভিন্ন হামলা ও সহিংসতার ঘটনাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ ও তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। পুলিশ সদর দপ্তরের নথিপত্র এবং মাঠ পর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদন নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণের পর জানানো হয়েছে, সারা দেশে নথিবদ্ধ মোট ৬৪৫টি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে কেবল ৭১টি ঘটনায় সরাসরি ‘সাম্প্রদায়িক উপাদান’ বা ধর্মীয় বিদ্বেষের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, অবশিষ্ট ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, বরং পাড়া-মহল্লার বিরোধ, জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফল।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর), সাধারণ ডায়েরি (জিডি), পুলিশের চার্জশিট এবং চলমান তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এই সমন্বিত প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সরকার বলছে, প্রকৃত ঘটনা এবং অপরাধের ধরন সম্পর্কে জনমনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে সঠিক চিত্র তুলে ধরতেই এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রদায়িক উপাদানযুক্ত ৭১টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ধর্মীয় স্থাপনা এবং প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ৩৮টি, মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ৮টি এবং মন্দিরে চুরির ঘটনা ছিল ১টি। এছাড়া একটি হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যান্য ২৩টি ঘটনার মধ্যে রয়েছে সোশাল মিডিয়ায় উসকানিমূলক পোস্ট, প্রতিমা ভাঙার হুমকি এবং পূজামণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো বিষয়গুলো। এসব অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ এ পর্যন্ত ৫০টি নিয়মিত মামলা নথিবদ্ধ করেছে এবং অভিযুক্ত ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ২১টি ঘটনায় অন্যান্য প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পুলিশের তথ্যের বরাতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানিয়েছে যে, সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া ৫৭৪টি ঘটনার কোনোটিতেই সাম্প্রদায়িক মোটিভ বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না। এই বিশাল অংশের ঘটনার মধ্যে প্রতিবেশী বিরোধের ৫১টি, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের ২৩টি এবং চুরির ১০৬টি ঘটনা রয়েছে। এছাড়া পূর্ব শত্রুতার জেরে ২৬টি হামলা এবং ১৭২টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ অপরাধ হিসেবেই গণ্য হয়েছে। এমনকি ৫৮টি ধর্ষণের ঘটনাকেও অসাম্প্রদায়িক সাধারণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও অপহরণ, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো আরও ১৩৮টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এসব ঘটনায় ৩৯০টি নিয়মিত মামলা এবং ১৫৪টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ৪৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব বিশ্বাসের মানুষের এক অভিন্ন দেশ এবং এখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করার অধিকারী। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক অঙ্গীকার। সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, উপাসনালয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধ করা এবং গুজব ছড়িয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে কোনো অপরাধমূলক ঘটনাকে অহেতুক সাম্প্রদায়িক রঙ দিয়ে যেন অস্থিতিশীলতা তৈরি করা না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার মাধ্যমে দেশে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
নথিবদ্ধ এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের মাধ্যমে সরকার এটিই স্পষ্ট করতে চেয়েছে যে, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলেও সেগুলোকে ঢালাওভাবে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর। মাঠ পর্যায়ের তদন্ত এবং অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতেই এই পৃথকীকরণ করা হয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।
















