আগুনের সূত্রপাত শর্টসার্কিটে
রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই পরিবারের ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় অগ্নিকাে র সূত্রপাত নিশ্চিত হয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ভবনের দ্বিতীয় তলার রান্নাঘর অক্ষত থাকায় ডাইনিং রুমের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। এদিকে গতকালও ঘটনাস্থল উত্তরা ১১ সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর ছয় তলা বাড়িটির সামনে দেখা গেছে উৎসুক মানুষের ভিড়। কেউ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন, আবার কেউ ছবি তোলা ও ভিডিও করায় ব্যস্ত। দুই দিন আগেও ভবনটি কোলাহলপূর্ণ ছিল, এখন সুনসান। আতঙ্কে বাসিন্দাদের অনেকেই অন্যত্র আত্মীয়দের বাসায় চলে গেছেন। অনেকে সাময়িক সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে আসছেন, আবার পরিস্থিতি বুঝতে বাসায় ঘুরে আবার চলে যাচ্ছেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানান, এ ঘটনায় গতকাল পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিন, সদস্যসচিব ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটি গঠন হওয়ার পরই তাঁরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বাড়ির মালিকের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটটির সম্ভাব্য জায়গাগুলো তাঁরা পর্যবেক্ষণ এবং বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তদন্ত কমিটি সূত্র জানিয়েছেন, ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা মিলে বাড়ির মালিকের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট। দ্বিতীয় তলায় ছিল রান্নাঘর, ড্রয়িং ও ডাইনিং রুম। ভবনের ভিতরে দেয়ালের পলেস্তারা উঠে যাওয়ায় শুরুতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের সন্দেহ করা হয়। কিন্তু রান্নাঘর ও গ্যাসের চুলা অক্ষত পাওয়া গেছে।
প্রাথমিকভাবে তদন্ত কমিটির সদস্যরা নিশ্চিত হয়েছেন, ডাইনিং রুমে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ডাইনিং রুমটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দিয়ে ডেকোরেশন করা হয়েছিল। রুমটি ছিল শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। সেখানে টেলিভিশন, আলোকসজ্জার জন্য বড় ঝাড়বাতি ও বিভিন্ন বাল্ব ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো একটি সংযোগ থেকে শর্টসার্কিট হওয়ার পর দাহ্য পদার্থের বোর্ডে মোড়ানো ডেকোরেশন আগুন ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে। আগুন বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠে যায়। আর বাসাটি ডেকোরেশনের বোর্ডগুলোর কারণে অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গত হয়।
তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের অন্যতম কাজ হচ্ছে অগ্নিকাে র কারণ খুঁজে বের করা। সেটি উদ্ঘাটনে আগামীকাল (আজ) আবারও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হবে।’ উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি রফিক আহমেদ বলেন, ‘এ ঘটনায় এখনো অপমৃত্যু মামলা বা অন্য কোনো বিষয়ে কেউ কোনো আবেদন করেনি। আইনি পদক্ষেপের জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’
যেভাবে রক্ষা পান নিজামের স্ত্রী-সন্তানরা : গতকাল ভবনটির পঞ্চম তলার বাসিন্দা মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘অগ্নিকাে র সময় আমি বাইরে ছিলাম। রুমে আমার স্ত্রী-সন্তানরা ছিল। অগ্নিকাে র সময় তারা টয়েলেটের ভিতরে দরজা লাগিয়ে বসে ছিল। তাই আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের লোকজন যখন মাইকে ডাকাডাকি করছিলেন, তখন তারা বেরিয়েছিল। তারপর ফায়ার সার্ভিসের লোকজন তাদের উদ্ধার করে।’ বাড়িটির কেয়ারটেকার বিপ্লব মিয়া বলেন, ‘বাসা এখন পুরো ফাঁকা। আমি ও সেক্টর কল্যাণ সমিতির লোক পাহারা দিচ্ছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অন্য সব ফ্ল্যাটের মালামাল ঠিক আছে।’
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, উত্তরায় আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত একই পরিবারের তিনজনকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া কাজীবাড়িতে দাফন করা হয়েছে। গতকাল তাদের জানাজা শেষে পারিবারিব কবরস্থানে দাফন করা হয়। ?নিহতরা হলেন চিওড়া কাজীবাড়ির কাজী খোরশেদ আলমের ছেলে কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাঁদের দুই বছরের একমাত্র সন্তান কাজী ফাইয়াজ রিশান। তাঁদের বাড়িতে এখনো মাতম চলছে।
?নিহতের ফুপাতো ভাই কাজী নাহিদ জানান, ফজলে রাব্বি উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের চিওড়া ঐতিহ্যবাহী কাজীবাড়ির সন্তান। কুমিল্লা শহরেও তাঁদের বাড়ি রয়েছে। রিজভী ওষুধ প্রস্তুতকারক এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে কর্মরত ছিলেন।
















