১১ জানুয়ারি ২০২৬: চলমান গৃহযুদ্ধ ও তীব্র সমালোচনার মধ্যে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সাধারণ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ শুরু করেছে। রোববার ভোর ৬টা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১০০টি টাউনশিপে ভোটকেন্দ্র খুলেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সাগাইং, মাগওয়ে, মান্দালয়, বাগো ও তানিনথারি অঞ্চল ছাড়াও মন, শান, কাচিন, কায়াহ ও কায়িন রাজ্যের কিছু অংশে এই ধাপের ভোট হচ্ছে। এসব এলাকার অনেকগুলোতেই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংঘর্ষ হয়েছে অথবা এখনো কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকেই মিয়ানমার ভয়াবহ সংঘাতে জর্জরিত। অভ্যুত্থানের পর নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত নেতা অং সান সু চিকে আটক করা হয় এবং দেশজুড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
২০২০ সালের নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়া অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে সাম্প্রতিক নির্বাচনের জন্য নিবন্ধন না করায় বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই কারণে সামরিক শাসনবিরোধী আরও বহু রাজনৈতিক দল নির্বাচনের বাইরে রয়েছে।
চলমান সংঘাতের কারণে তিন ধাপে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হয় গত ২৮ ডিসেম্বর, যেখানে ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ১০২টিতে ভোট হয়। তৃতীয় ধাপের ভোটের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ জানুয়ারি। তবে অন্তত ৬৫টি টাউনশিপে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভোট হচ্ছে না।
সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, প্রথম ধাপে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫২ শতাংশ। একই সঙ্গে সামরিকপন্থী ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি জানিয়েছে, তারা নিম্নকক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ৮০ শতাংশের বেশি জয় পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দলটি কার্যত সামরিক বাহিনীর বেসামরিক মুখ।
ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, নির্বাচনের মাঠ সম্পূর্ণভাবে সামরিক বাহিনীর পক্ষে ঝুঁকে থাকায় এই ফল আশ্চর্যজনক নয়। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে বাদ দেওয়া এবং বিরোধিতা দমনের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মিয়ানমারের জাতীয় সংসদ দুই কক্ষবিশিষ্ট, মোট আসন ৬৬৪টি। সংবিধান অনুযায়ী, সামরিক বাহিনী স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুই কক্ষেই ২৫ শতাংশ আসন পায়। নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সরকার গঠনের সুযোগ পায়।
রোববার সকালে রাজধানী ইয়াঙ্গুনসহ বিভিন্ন শহরে স্কুল, সরকারি ভবন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভোট দিতে দেখা গেছে মানুষকে। অং সান সু চির সাবেক নির্বাচনী এলাকা কাওহমুতেও ভোটগ্রহণ হয়েছে।
কিছু ভোটার জানিয়েছেন, তারা শান্তির আশায় ভোট দিয়েছেন। তবে অনেকে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এই নির্বাচনের ফল পুরোপুরি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এর কোনো ভূমিকা নেই।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নির্বাচনকে ভুয়া আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ বলেছেন, এই ভোট কোনোভাবেই অবাধ, সুষ্ঠু বা বৈধ নয় এবং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা মাত্র।
নির্বাচনের আগে প্রণীত আইনে ভোট নিয়ে সমালোচনা বা প্রতিবাদ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই আইনে ইতোমধ্যে ২০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অভিযোগে বর্তমানে অন্তত ২২ হাজার মানুষ মিয়ানমারে আটক রয়েছেন বলে জানিয়েছে রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তাকারী একটি সংগঠন।
















