সম্মান ও মূল্যায়নের সংকটে দীর্ঘদিনের মিত্রকে হারাল বিএনপি; জামায়াতের ‘ভোলবদল’ ও নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মেরুকরণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও একটি নাটকীয় পটপরিবর্তনের সাক্ষী হলো দেশ। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বীর বিক্রম এখন বিএনপির প্রতিপক্ষ শিবিরের সঙ্গী। আসন ভাগাভাগি নিয়ে টানাপড়েন আর পুঞ্জীভূত অবহেলার অভিযোগ তুলে তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নতুন ৮ দলীয় জোটে যোগ দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের পুরনো ঘর ছেড়ে অলির এই প্রস্থানকে বিএনপির জন্য বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | দুপুর ১২:৩০ মিনিট
ফারহানা নীলা | স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জামায়াত আমিরের পাশে বসা অলি আহমদের ছবি দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যে নেতা একদিন বিএনপিকে সুসংহত করতে জীবন বাজি রেখেছিলেন, আজ তিনি সেই দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘অবহেলার’ অভিযোগ তুলে নতুন পথ বেছে নিলেন।
অবহেলার অভিযোগে পুড়ল সেতু
কর্নেল অলি আহমদের দাবি, গত আড়াই বছর ধরে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অভিমানী। তিনি বলেন, “একটা সময় সবাই আমার বাসায় আসত, পরামর্শ নিত। আমি ১৪ জনের একটি তালিকা পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তারা সৌজন্যমূলক একটি ফোন করার প্রয়োজনও মনে করেনি। মনে হয়েছে, বিএনপির হয়তো আমাকে আর প্রয়োজন নেই।”
ঘরের শত্রু বিভীষণ ও মহাসচিবের পদত্যাগ
অলি আহমদের এই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এলডিপির সাবেক মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদের বিএনপিতে যোগদান। নিজ দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডকে বিএনপি লুফে নিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে মনোনয়ন দেওয়ায় অলি আহমদ একে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ও তাঁর দল ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। এই মানসিক ধাক্কাই তাঁকে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ হতে ত্বরান্বিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
জামায়াতের চাল: ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ইমেজের কার্ড
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী এখন তাদের পুরনো ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পেতে মরিয়া। সেখানে অলি আহমদের মতো একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে জোটে পাওয়া তাদের জন্য বিশাল ‘মাস্টারস্ট্রোক’। এটি জামায়াতকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির ভোটব্যাঙ্কেও ফাটল ধরাতে পারে। জানা গেছে, নতুন এই জোটে অলি আহমদকে ৬টি আসন ছাড়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যা বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছিল।
বিএনপির পাল্টা যুক্তি
বিষয়টিকে অলি আহমদের ‘ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ’ হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জোট রাজনীতিতে ছাড় দেওয়ার একটি সীমা থাকে। তৃণমূলের দাবি উপেক্ষা করে তাঁর সব দাবি মানা সম্ভব ছিল না। এছাড়া জামায়াতের সঙ্গে তাঁর গোপন ঘনিষ্ঠতা আমাদের আগেই অবাক করেছিল।”
মিশ্র জোট না কি ক্ষমতার সমীকরণ?
জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এলডিপি-র এই জোটকে বলা হচ্ছে একটি ‘হাইব্রিড অ্যালায়েন্স’। এখানে একদিকে যেমন ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে, তেমনি অলি আহমদের মতো জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পুরোনো মুখও রয়েছেন। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের পাশে অলি আহমদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁরা ক্ষমতার একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে চান।
যমুনা সেতুর কাজ যাঁর হাতে শুরু হয়েছিল, যিনি জিয়ার বিশ্বস্ত ছায়া ছিলেন, আজ তিনি জিয়ার গড়া দলের বিরুদ্ধেই রণক্ষেত্রে। এই বিচ্ছেদ কেবল একটি দলবদল নয়, বরং বাংলাদেশের জোট রাজনীতির ভঙ্গুর দশারই বহিঃপ্রকাশ।
















