৭ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশ সরকার চীনের কাছ থেকে সর্বাধুনিক ২০টি ‘জে-১০সি’ মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে, যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার। এই উদ্যোগের লক্ষ্য, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও মজবুত করা।
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ক্রয়, যা বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সামরিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করবে — এমন সময়ে যখন দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাব বলয়ের প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
বাংলাদেশ তার বিমানবাহিনীকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্য নিয়ে চীনের কাছ থেকে ২০টি ‘জে-১০সি’ মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের এই সম্ভাব্য চুক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও এক নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ক্রয়। সরকারি সূত্র বলছে, কেনার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চীনের সঙ্গে এই লেনদেন ‘সরকার-টু-সরকার’ (G2G) ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে এবং পরিশোধের সময়সীমা থাকবে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত।
কেন ‘জে-১০সি’ গুরুত্বপূর্ণ চীনের তৈরি ‘জে-১০সি’, যাকে ‘ভিগোরাস ড্রাগন’ নামেও ডাকা হয়, একাধারে আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা চালাতে সক্ষম। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ২,৪১৫ কিলোমিটার, যা শব্দের গতির ২.২ গুণ। অত্যাধুনিক রাডার ও স্টিলথ প্রযুক্তির কারণে এটি শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে দীর্ঘ সময় আকাশে টহল দিতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধবিমানের বহরে প্রধানত রয়েছে পুরোনো চীনা ‘এফ-৭’ এবং রাশিয়ান ‘মিগ-২৯বি’ বিমান। তাই নতুন প্রজন্মের জে-১০সি যুক্ত হলে তা বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চুক্তির বিষয়টি কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং কৌশলগতও। চীন ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা অংশীদার। এখন যদি বাংলাদেশও জে-১০সি বিমান অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সামরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে যা ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য।
যুক্তরাষ্ট্রও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। ফলে, বাংলাদেশ চীনা যুদ্ধবিমান কিনলে সেটি ওয়াশিংটন–ঢাকা সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এএনএম মুনিরুজ্জামান বলেন,
“যুদ্ধবিমান কেনা শুধু প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আঞ্চলিক কূটনীতি ও ভারসাম্য রক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে নতুন বৈশ্বিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে, তার প্রভাব বাংলাদেশকেও বিবেচনা করতে হবে।”
এই অর্থ ১০ অর্থবছরে পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক চাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই ব্যয় নীতিগতভাবে “ঝুঁকিপূর্ণ হলেও কৌশলগতভাবে যৌক্তিক” হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্যের নতুন ধারা ভারত ইতিমধ্যে ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করেছে। পাকিস্তান চীনের জে-১০সি ব্যবহার করছে। এখন যদি বাংলাদেশও একই যুদ্ধবিমান পায়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে এক ধরনের “প্রযুক্তিগত ভারসাম্য” সৃষ্টি হতে পারে — যা ভবিষ্যৎ কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে।

অর্থনৈতিক দিক ও চুক্তির কাঠামো প্রত্যেকটি জে-১০সি বিমানের প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার। সঙ্গে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো খাতে আরও ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২০ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শওকত রহমানের মতে,
“বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত দেখায়, দেশটি এখন প্রতিরক্ষাকে শুধুমাত্র সামরিক নয়, কূটনৈতিক ভারসাম্যের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে।”
সামনে কী? চুক্তি নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও সরকারি সূত্র বলছে, বিষয়টি এখন মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে এই চুক্তি সম্পন্ন করে, তবে এটি কেবল সামরিক আধুনিকায়নের নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিতেও একটি বার্তা পাঠাবে বাংলাদেশ এখন নিজের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে আরও স্বাধীন ও হিসাবি পথ বেছে নিচ্ছে।
















