সুদানের পশ্চিম কর্ডোফানের গুরুত্বপূর্ণ শহর বাবনুসা ঘিরে আবারও তুমুল বিভ্রান্তি। আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দাবি করেছে, তারা শহরটি পুরোপুরি দখল করেছে। কিন্তু সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) সেই দাবি সরাসরি নাকচ করে বলেছে—বাবনুসার লড়াই এখনো শেষ হয়নি, তাদের সৈন্যরা শহরে রয়ে গেছে, প্রতিরোধ চালিয়েই যাচ্ছে।
মঙ্গলবার সামরিক সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আরএসএফের নতুন হামলা তারা প্রতিহত করেছে। এর আগের দিন আরএসএফ জানায়, সপ্তাহব্যাপী অবরোধের পর তারা শহরের সেনা ঘাঁটি দখল করেছে—যা বাবনুসা নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। পরে প্রকাশিত ভিডিওতেও দেখা যায়, আরএসএফ যোদ্ধারা সেনা সদরদপ্তরের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
খারতুম থেকে আল জাজিরার হিবা মরগান জানান, সেনাবাহিনী যদিও বলছে যুদ্ধ এখনো চলছে, তবে অন্তত প্রধান ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ আরএসএফের হাতে চলে গেছে—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। যদি আরএসএফ বাবনুসায় তাদের অবস্থান পোক্ত করতে পারে, তবে পশ্চিম কর্ডোফানের ওপর তাদের দখল আরও দৃঢ় হবে, আর দেশের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রবেশপথগুলো একে একে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
বাবনুসা শুধু একটি শহর নয়—এটি দারফুর অঞ্চলে প্রবেশের জীবনরেখা। সেনাবাহিনীকে দারফুর বা কর্ডোফানের অন্য কোনো অংশে যেতে হলে এই শহর দিয়েই যেতে হয়। তাই শহরটি হারানো মানে সেনাবাহিনীর জন্য আরও কঠিন সময়, আরও অনিশ্চিত পথ।
একই সময়ে কর্ডোফানের অন্যান্য এলাকায়, বিশেষ করে আব্বাসিয়া তাগালি অঞ্চলে, তীব্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতি আরএসএফ দারফুরের সর্বশেষ সেনা ঘাঁটি এল-ফাশের দখলে নেয়। সেই জয়ের গতি নিয়েই তারা এগোচ্ছে বাবনুসার দিকে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের ভাষায়—আরএসএফের হাতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, ধর্ষণের মতো নৃশংসতার প্রমাণ একের পর এক জমা হচ্ছে।
আরএসএফ একতরফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবে দেখা যায়নি। মিশর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গঠিত ‘কোয়াড’ উদ্যোগের পর এই যুদ্ধবিরতি আসে। কিন্তু এসএএফ বলছে—এটি কেবল একটি রাজনৈতিক চাল, যাতে আমিরাতের অব্যাহত সহায়তা আড়াল করা যায়। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বাবনুসা পুরোপুরি পতিত হলে আরএসএফ পরবর্তী লক্ষ্য করবে উত্তর কর্ডোফানের ঐতিহাসিক শহর এল-ওবেইদকে। শহরটি ধসে পড়লে রাজনৈতিক ভূমিকম্প তৈরি হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এটি শুধুই একটি অঞ্চল নয়—একটি বড় বাণিজ্যকেন্দ্র, আঞ্চলিক রাজধানী, এবং আরএসএফকে খারতুমের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার সিঁড়ি।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই নির্মম যুদ্ধে ক্ষমতার পালা বারবার বদলেছে। একসময় খারতুমে আরএসএফকে পিছু হটাতে সক্ষম হলেও, দারফুর পুরোপুরি হারানোর পর এখন কর্ডোফানের দিক থেকেও হুমকি ঘনিয়ে এসেছে সেনাবাহিনীর ওপর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দালিয়া আবদেলমোনিয়েম বলছেন—আরএসএফ এখন গতি পেয়েছে, আর তারা থামবে না। দক্ষিণ কর্ডোফানের নুবা পর্বতমালা অঞ্চল তো আগেই তাদের মিত্র এসপিএলএম-এন এর হাতে চলে গেছে।
এই যুদ্ধ যেন ক্রমেই গ্রাস করছে একটি জাতির ভূমি, ভবিষ্যৎ আর স্বপ্নকে। বাবনুসার মাটিতে আজ যা ঘটছে—তা শুধু একটি শহরের যুদ্ধ নয়, বরং সুদানের হৃদয়ে লেখা হচ্ছে নতুন এক অস্থির অধ্যায়, যার শেষ এখনও অদৃশ্য, অনিশ্চিত, কুয়াশায় ঢাকা।
















