ইয়াবা–কেন্দ্রিক অপরাধ, সিভিল টিম ও মাসোহারা চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগ
কক্সবাজারে র্যাব-১৫–এর কমান্ডিং অফিসারসহ প্রায় সব কর্মকর্তা–কর্মচারীকে সদর দপ্তরে একযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইয়াবা চক্র, সিভিল টিম ও মাসোহারা বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগের পর ব্যাপক বদলি আদেশ জারি হয়েছে। র্যাব বলছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজারে র্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের প্রায় পুরো ইউনিটকে একযোগে প্রত্যাহার করেছে র্যাব সদর দপ্তর। সমুদ্র ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এই জেলায় ইয়াবা চোরাচালান, চাঁদাবাজি, সিভিল টিমের মাধ্যমে মাসোহারা বাণিজ্য এবং র্যাব সদস্যদের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলামকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বদলি করা হয়েছে টু আইসি ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যসহ শত শত কর্মকর্তাকে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ব্যাটালিয়নের বহু কর্মকর্তা–সদস্য ব্যক্তিগত ‘এফএস’ বা ফিল্ড স্টাফ (সিভিল টিম) ব্যবহার করে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য বাণিজ্য এবং মাসোহারা আদায়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এসব সিভিল সদস্যরা র্যাব কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে নিয়মিত অর্থ আদায় করতেন। বিশেষ করে করপোরাল ইমাম ও লুৎফরসহ কয়েকজন সরাসরি বড় চোরাকারবারিদের সঙ্গে লেনদেন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
র্যাব সদর দপ্তরের পাঁচটি পৃথক প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, বাবুর্চি, সুইপার, হাবিলদার, এসআই, এএসআই, নায়েক, করপোরাল, কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পদের মোট ৬৩৪ সদস্যকে বদলি বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে অন্যান্য ইউনিটে পাঠানো হয়েছে এবং সমান সংখ্যক সদস্যকে নতুন করে কক্সবাজারে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে।
শুধু নভেম্বর মাসেই কয়েকটি দফায় ১৯৮ জন, ২০০ জন, ১০০ জন, ৬২ জন এবং সর্বশেষ আরও ৭৪ জনের বদলি আদেশ জারি হয়েছে।
র্যাব–১৫–এর প্রায় পুরো কর্মী কাঠামো এক মাসেই পাল্টে গেছে।
র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক এম জেড এম ইন্তেকাব চৌধুরী বলেন, সিও এক বছরের বেশি সময় ধরে কক্সবাজারে কর্মরত থাকায় তাকে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সদর দপ্তরে নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, “সব সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়নি। তদন্তের বিষয়টি অপারেশন শাখা দেখছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয় সূত্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারে র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ইয়াবা লেনদেন, অভিযান পরিচালনার নামে অর্থ ভাগাভাগি এবং চোরাচালানকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কয়েকদিন আগে কুতুপালং র্যাব ক্যাম্পের কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ইয়াবা ও নগদ অর্থ আটক করে আত্মসাৎ করার অভিযোগও উঠে আসে।
সচেতন মহল বলছে, শুধু বদলি দিয়ে দায় শেষ করলে একই চক্র আবার নতুন জায়গায় সক্রিয় হয়ে উঠবে। সংবেদনশীল কক্সবাজার—যেখানে ইয়াবা, মানব পাচার, চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বহু বছর ধরে জটিল—সেখানে দায়িত্বশীল বাহিনীর অপরাধে জড়িত হওয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় সংকেত।
বিগত সরকার আমলে র্যাবের বিরুদ্ধে গুম, ক্রসফায়ার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচনা ছিল। কক্সবাজারে কাউন্সিলর একরামুল হত্যা সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
এখন র্যাব, পুলিশ, বিজিবি—তিন বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই একের পর এক অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। মাদককেন্দ্রিক ‘লোভ ও ঝুঁকি’ নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট তদন্ত, জবাবদিহি ও কঠোর শাস্তি ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
















