গ্যালারিজুড়ে হাজারো মানুষের বাঁধভাঙা গর্জন, চোখের কোণে জমে থাকা আবেগের জল আর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসির অপূর্ব এক ক্যানভাসে রচিত হলো আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির বর্ণাঢ্য ও ঐতিহাসিক এক অধ্যায়ের অন্তিম কাব্য। দীর্ঘ ২১ বছরের এক রূপকথাভিত্তিক নীল-সাদা জার্সির অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা নামল বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে। বেনিনের বিপক্ষে আয়োজিত এই ঐতিহাসিক ম্যাচে জয় কিংবা হারের গাণিতিক হিসেবকে সম্পূর্ণ পেছনে ফেলে ম্যাচের মূল আকর্ষণ ও একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল কেবলই ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি ‘লিওনেল আন্দ্রেস মেসি’।
বিদায়ের এই চরম আবেগঘন আবহ ও পরিবেশ তৈরি হয়েছিল ম্যাচ মাঠে গড়ায় অনেক আগেই। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের টিম বাসে চড়ে যখন মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মেসি, তখন রাজপথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো ভক্ত-সমর্থকের ভালোবাসার বাঁধভাঙা জোয়ার দেখে নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি এই মহাতারকা। বাসের কাঁচের ভেতর থেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তিনি এবং বাইরে সমবেত ভক্তদের উদ্দেশে হাত নেড়ে তাদের নিঃশর্ত ভালোবাসার অভিনব জবাব দেন। এরপর স্টেডিয়ামে পৌঁছে শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে মাঠের পিচে ওয়ার্ম-আপ করতে নামলে দুই হাত উঁচিয়ে পুরো গ্যালারিকে উষ্ণ অভিবাদন জানান তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরো স্টেডিয়াম ফেটে পড়ে গগনবিদারী করতালিতে। স্টেডিয়ামের ঘোষক যখন মাইকে ঘোষণা করে বললেন— ‘শেষবারের মতো ১০ নম্বর জার্সিতে, আমাদের দলীয় অধিনায়ক, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা… ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি’, তখন পুরো বুয়েনস আইরেস শহর আনন্দের ও আবেগের এক অভূতপূর্ব আলোড়নে কেঁপে ওঠে।
ম্যাচের সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর ও আবেগঘন মুহূর্তটি উপস্থিত হয় ঠিক যখন আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হচ্ছিল। সংগীতের সুর বেজে ওঠার পরপরই কোচ লিওনেল স্কালোনির মতো মেসির চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। সামনে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে থাকা এই মহানায়কের ঠিক পেছনেই সগর্বে উড়ছিল ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের পতাকা। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সেই কয়েকটি পলক যেন সময়ের স্রোতে থমকে গিয়েছিল মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে; চারপাশের সমস্ত কোলাহল ও উল্লাস ভুলে মেসি তখন ডুব দিয়েছিলেন তাঁর দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের হাজারও স্মৃতিময় সাগরে। তবে পরক্ষণেই চোখের নোনা জল সযত্নে সামле নিয়ে গ্যালারির দিকে তাকিয়ে ভক্ত-সমর্থকদের উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে তাঁর ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক চিলতে তৃপ্তির অমলিন হাসি, যা ছিল লাখো মানুষের বিশুদ্ধ ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার এক পরম ও সুগভীর প্রশান্তি।
মাঠের লড়াই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও বিদায়ের এই তীব্র আবেগ ও সম্মান জানানোর পর্ব থেমে থাকেনি। প্রথমার্ধের ঠিক দশম মিনিটে (১০ম মিনিট) হুট করেই ম্যাচের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিতে এক অভাবনীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত বিরতি তৈরি হয়। ম্যাচের প্রতিপক্ষ দল বেনিনের খেলোয়াড়েরা পূর্বেই তাদের পরিকল্পনা জানিয়ে রেখেছিলেন যে তারা সর্বকালের সেরা এই ফুটবলারের শেষ ম্যাচটি মাঠে থেকে পুরোপুরি উপভোগ করতে চান। সেই কথা ও সম্মান বজায় রেখেই ম্যাচ চলাকালীন বল থামিয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা স্বয়ং এগিয়ে আসেন এবং মেসিকে আন্তরিক বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান। আর এই দৃশ্য দেখার সাথে সাথেই পুরো মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের দর্শকেরা নিজ আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে একযোগে করতালির মাধ্যমে তাদের পরম প্রিয় ১০ নম্বর জার্সিধারীকে সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
২০০৫ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ ২১ বছরের এই মহাকাব্যিক পথচলা কখনোই পুষ্পে বিছানো ছিল না; বরং এই যাত্রায় যেমন ছিল অজস্র পরাজয়ের পুঞ্জীভূত যন্ত্রণা, কঠোর সমালোচনা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি, তেমনি ছিল কোপা আমেরিকা ও অমর বিশ্বকাপ জয়ের অনির্বচনীয় আনন্দ। পরিশেষে জীবনের সব কান্না, কষ্ট, সংগ্রাম আর অবিস্মরণীয় প্রাপ্তিকে একটি সুতোয় গেঁথে বুয়েনস আইরেসের নীল-সাদা সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে এক বুক তৃপ্তির হাসিতে নিজের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ পাতায় সুন্দরভাবে দাড়ি টানলেন ফুটবলের এই অনন্য রাজপুত্র।

























