গত ১৮ অক্টোবর ১ লাখ ৬৭ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ৮ দশমিক ৫ টন ব্লক ফ্রোজেন ‘ওশান টাইগার’ চিংড়ি ইউরোপের বেলজিয়ামে রপ্তানি করা হয়। চালানটি পাঠায় বাংলাদেশের শিল্পভিত্তিক মৎস্য আহরণকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান র্যানকন সি ফিশিং লিমিটেড।
চিংড়ি শিল্পে নতুন দিগন্ত: অন-বোর্ড ব্লক ফ্রোজেন ‘ওশান টাইগার’ রপ্তানি হলো ইউরোপে
ঢাকা, ৯ নভেম্বর ২০২৫: বছরের পর বছর ধরে মন্দা চলার পর বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি শিল্প নতুন করে আশার আলো দেখছে। প্রথমবারের মতো দেশ থেকে ইউরোপে পাঠানো হয়েছে অন-বোর্ড ব্লক ফ্রোজেন ‘ওশান টাইগার’ চিংড়ি। রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই যুগান্তকারী উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের চিংড়ি খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
গত ১৮ অক্টোবর ১ লাখ ৬৭ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ৮ দশমিক ৫ টন ব্লক ফ্রোজেন ‘ওশান টাইগার’ চিংড়ি ইউরোপের বেলজিয়ামে রপ্তানি করে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তিক মৎস্য আহরণকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান র্যানকন সি ফিশিং লিমিটেড।
অন-বোর্ড ব্লক ফ্রিজিং: গুণগত মানের নতুন মানদণ্ড
অন-বোর্ড ব্লক ফ্রিজিং পদ্ধতি সাধারণ হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এই পদ্ধতিতে:
- প্রক্রিয়াকরণ: চিংড়ি সমুদ্রে ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের ভেতরেই বাছাই, শ্রেণিবিন্যাস, মাথা অপসারণ, ধোয়ার কাজ এবং হিমায়িত করা হয়।
- গুণগত মান নিশ্চিতকরণ: র্যানকন সি ফিশিং ডিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর শাহরিয়ার রিমন জানান, তারা ‘লাক্স মিটার’ ব্যবহার করে আলোকমাত্রা নিশ্চিত করেন এবং মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে প্রতিটি ব্যাচ পরীক্ষা করে দূষক-মুক্ততা নিশ্চিত করেন।
- সংরক্ষণ: চিংড়িগুলোকে ৮০০ গ্রাম থেকে ২ কেজি ওজনের ব্লকে প্রক্রিয়াজাত করে জাহাজের কোল্ড স্টোরেজে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়।
- আইনগত প্রস্তুতি: চালান পাঠানোর আগে ফিশ ইনস্পেকশন অ্যান্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল (এফআইকিউসি) অফিস থেকে স্বাস্থ্য সনদ নেওয়া হয়। র্যানকনের জাহাজগুলো আইএসও ও এইচএসিএসপি সার্টিফায়েড এবং কঠোরভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্দেশিকা অনুসরণ করে।
রিমন এই চালানকে ‘কেবল একটি বাণিজ্যিক চালান নয়, এটি একটি মাইলফলক’ বলে অভিহিত করেছেন, যা রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ইইউ সার্টিফিকেশনের পথে যাত্রা
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ কেবল জাপানে ব্লক ফ্রোজেন চিংড়ি রপ্তানি করলেও জাহাজে ধরা ও প্রক্রিয়াজাত করা অন-বোর্ড ব্লক ফ্রোজেন চিংড়ির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদন ছিল না।
- অনুমোদন লাভ: এফআইকিউসি, মেরিন ফিশারিজ ডিপার্টমেন্ট (এমএফডি) এবং এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (ইপিবি)-এর সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির পরিবর্তন আসে।
- জাহাজ পরিদর্শন: ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইইউ ফুড সেফটি অথরিটির পরিদর্শন দল বাংলাদেশের নির্বাচিত কয়েকটি জাহাজ মূল্যায়ন করে।
- ইইউ তালিকাভুক্তি: কয়েক মাসের মূল্যায়নের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাঁচটি জাহাজকে অন-বোর্ড ব্লক ফ্রোজেন সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির অনুমোদন দেয়।
- এফআইকিউসি: উপপরিচালক ফারহানা লাভলী জানান, আরও কয়েকটি জাহাজের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া চলছে এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ এ খাতের পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পুনরুদ্ধার ও চ্যালেঞ্জসমূহ
একসময় বিশ্বের শীর্ষ চিংড়ি রপ্তানিকারকদের মধ্যে থাকলেও রোগবালাই ও আন্তর্জাতিক মান রক্ষায় দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্রুত কমে যায়। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে রপ্তানি দাঁড়ায় ২৪৮ মিলিয়ন ডলারে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরের বছর তা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২৯৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
| রপ্তানির চ্যালেঞ্জ | বর্তমান অবস্থা |
| খরচ বৃদ্ধি | গত পাঁচ বছরে জ্বালানির দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। |
| আহরণ হ্রাস | গত বছর সামুদ্রিক চিংড়ি ও মাছের আহরণ প্রায় ২১ শতাংশ কমেছে (অতি আহরণ ও দূষণের কারণে)। |
| প্রণোদনা | ৮ শতাংশ রপ্তানি প্রণোদনা শিল্পটিকে টিকিয়ে রেখেছে। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটি ৫ শতাংশে নামানো এবং নভেম্বরে পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথা রয়েছে। |
| বাজার সীমিত | আগে ব্লক ফ্রোজেন চিংড়ি কেবল জাপান ও চীনের বাজারে রপ্তানি হতো। |
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান
অবজারভেটরি অব ইকনমিক কমপ্লেক্সিটি (ওইসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী হিমায়িত চিংড়ি বাণিজ্যের প্রায় ১.৪ শতাংশ অংশীদারিত্ব ছিল বাংলাদেশের (প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার)।
র্যানকন সি ফিশিং এর পরবর্তী লক্ষ্য হলো ব্রাউন ব্লক ফ্রোজেন চিংড়িও ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি করা এবং গুণগত মান, ট্রেসেবিলিটি ও টেকসই আহরণের সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে ইউরোপের অন্যান্য দেশে বাজার সম্প্রসারণ করা।
















