দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট কাটিয়ে পর্যটন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়া। একসময় আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় পর্যটন কার্যত ভেঙে পড়লেও, সরকারের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে দেশটি আবারও আন্তর্জাতিক ভ্রমণপ্রেমীদের আকর্ষণ করতে শুরু করেছে।
মৌরিতানিয়ার আদরার অঞ্চলের বিখ্যাত ‘রিশাত স্ট্রাকচার’ বা ‘আই অব আফ্রিকা’ এলাকায় পর্যটকদের অপেক্ষায় থাকেন ৪৯ বছর বয়সী ফাতিমা শেখ মোহাম্মদ বুয়া। বিশাল বৃত্তাকার ভূতাত্ত্বিক গঠনটি মহাকাশ থেকেও দেখা যায় এবং অনেকের কাছে এটি হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস নগরীর সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবেও পরিচিত।
পর্যটকদের জন্য তাঁবু ভাড়া, খাবার পরিবেশন এবং স্থানীয় স্মারক বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন বুয়া। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে একসময় এই ব্যবসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তবে এখন আবার নতুন করে শুরু করেছেন।
২০০০-এর দশকের শুরুতে মৌরিতানিয়া ছিল সাহারা মরুভূমি ভ্রমণকারীদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার পর্যটক দেশটিতে আসতেন। তবে ২০০৭ সালে আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব (AQIM)-এর হামলায় চার ফরাসি পর্যটক নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর ধারাবাহিক নিরাপত্তা হুমকির কারণে পর্যটক সংখ্যা দ্রুত কমে যায় এবং বিখ্যাত ডাকর র্যালিও দেশটি থেকে সরে যায়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সীমান্ত এলাকায় বিশেষ সামরিক ইউনিট মোতায়েন করে, ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে উগ্রবাদবিরোধী প্রচার চালায় এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণও করা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর থেকে দেশে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেনি। ফলে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।
পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা জানান, ভিসা ফি কমানোর পর পর্যটক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে প্রায় সাত হাজার বিদেশি পর্যটক মৌরিতানিয়া ভ্রমণ করেছেন।
পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এখন বিশ্বের দীর্ঘতম মালবাহী ট্রেনগুলোর একটি, ‘আয়রন ওর ট্রেন’। মরুভূমির মধ্য দিয়ে চলা এই ট্রেনে চড়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণকারীরা আসছেন।
এছাড়া ঐতিহাসিক শহর ওয়াদান, সাহারার মরূদ্যান এবং রিশাত স্ট্রাকচার পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক পর্যটন স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, টিকিট ব্যবস্থা কিংবা উন্নত আবাসনের অভাব রয়েছে। যদিও সম্প্রতি রাজধানী নুয়াকশটে আন্তর্জাতিক হোটেল চেইন শেরাটনের প্রথম শাখা চালু হয়েছে, যা পর্যটন খাতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মরুভূমির স্বাভাবিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা এবং নিরাপদ পরিবেশই মৌরিতানিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটন বিপণনে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
















