চীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের পাশে সর্বাত্মকভাবে থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে। যেখানে বিএনপি ভূমিধ্বস বিজয় পেয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে। চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী। বিএনপি সরকার যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে চীন সর্বাত্মকভাবে বিএনপি সরকারের পাশে থাকতে চায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার ইনকিলাব ভবনে দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতকালে তিনি এসব কথা বলেন। চীনের রাষ্ট্রদূত চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়র মাধ্যমে চীনের বিষয়ে দেশের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরির জন্যও ধন্যবাদ জানান।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চীন বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছে। বিশেষ করে চীন ও বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের সম্পর্ক আরো জোরদার ও ঘনিষ্ঠতা উন্নয়নে কাজ করছি। আমরা ভবিষ্যত বাংলাদেশের দিতে তাকাতে চাই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে চীন বিএনপি সরকারের পাশে সর্বাত্মকভাবে থাকবে এবং বিএনপি সরকারের সঙ্গে সর্বাত্মকভাবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং চাপে পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও সারসহ নানা সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এছাড়াও আরো বেশকিছু চ্যালেঞ্জে দেখা দিয়েছে সরকারের সামনে। তবে এগুলো মোকাবেলায় সরকারকে অভিলক্ষ্য নির্ধারণ করে অতিরিক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যদিও চীন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ পরিমাণ ডিজেল দিচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীন এসব বিষয় প্রচার করে না। এ পরিমাণ ভারতের চেয়ে অনেক বেশি বলে জানান তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ যাতে আরো বেশি পরিমাণে সার পেতে পারে সে বিষয়েও চীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে কাজ করছে।
চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে চীনের ওপর বাংলাদেশ আস্থা রাখতে পারে। আমরা (চীন) নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রসেসে সহযোগিতা করতে পারি। আমরা বিএনপি এবং নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চাই, আমরা একত্রে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করতে পারি।
ইয়াও ওয়েন বলেন, চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত অংশীদারিত্ব। আমরা অর্থনীতির পাশাপাশি কৌশলগত ও সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছি। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিত বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছি। এছাড়া চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তারা বাংলাদেশের অবকাঠামো, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, ইলেক্ট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সসহ উৎপাদনমুখী খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ করতে চায়। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের ভোকেশনাল ট্রেনিং, তরুণদের স্কিল প্রোগ্রামের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনে সহযোগিতা করতে চায়। এছাড়া কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, বনায়ন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে চীন প্রস্তুত। আম ও কাঁঠালের মতো বাংলাদেশি ফল চীনের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশকে দেয়া চীনের বাণিজ্যিক সুবিধার কথা উল্লেখ করে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যে চীন শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। যা পৃথিবীর অন্য কোন বড় বা ছোট, শক্তিধর কোন দেশ বাংলাদেশকে দেয় না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প চুক্তি বাতিলের বিষয়ে চীনের অসন্তোষের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে ব্যক্তি স্বার্থকে প্রধান্য দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানী খাতে বেশকিছু চীনা বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছিল। বিশেষ করে সৌল বিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রায় ৩০টির বেশি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে দেয়ায় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে। এগুলো যথাযথভাবে কার্যকর হলে ইতোমধ্যেই বর্তমান বিএনপি সরকার কমপক্ষে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রস্তুত অবস্থায় পেত।
রাষ্ট্রদূত আরো জানান, চীন ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। দিন তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলে সেটি হবে ঐতিহাসিক সফর। রাষ্ট্রদূত বলেন, ইতোমধ্যে চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি গড়ে উঠছে, বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ চীনের বন্ধু ও শুভাকাক্সিক্ষ, আমরা মনে করি চীন-বাংলাদেশ ভাই-ভাই, খুব ভালো বন্ধু। এখন এ সম্পর্ককে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে এবং একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার। তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে সেই সম্পর্ক আরো পরিপক্ক হয়েছে এবং এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
তিনি বলেন, চীনই একমাত্র দেশ যারা বাংলাদেশে নিঃস্বার্থভাবে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করতে সক্ষম। কারণ তারা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত কিংবা সামরিক সব দিক থেকেই এখন শীর্ষে রয়েছে এবং আগামী দিনে তারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে।
ইনকিলাব সম্পাদক বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান যে অর্থনৈতিক সঙ্কট, জ্বালনি সঙ্কট, নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকা সার্বিক ক্ষেত্রে একমাত্র চীনই বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, চীনের উন্নয়ন সহযোগী হয়ে ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ণ এশিয়ার বহু দেশ এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ এসেছে। চীন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী, বাংলাদেশের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা দিতে চায়।
এ এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে ধনী করা সম্ভব, এই বিআরআই প্রকল্প, বন্দর এবং সবকিছুর মাধ্যমে। আমি মনে করি আমরা সবাই এর পক্ষে। আপনারা (চীন) ইতিমধ্যেই বেইজিং থেকে মাদ্রিদ পর্যন্ত ট্রেনে চালু করার বিষয়ে কাজ করছেন। বিআরই প্রকল্পটি হলে আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের ঢাকা থেকে ট্রেনে করে ইউরোপ যাওয়া যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শতভাগ চীনকে ভালোবাসেন। তিনি চীনের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ আছে এবং তিনি চীনের সঙ্গে কাজ করতে চান। আমি আশা করি গ্রীষ্মকালে তিনি চীন সফর করবেন।
এর আগে দৈনিক ইনকিলাবের বার্তা সম্পাদক মুহাম্মদ সানাহউল্লাহ চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে স্বাগত জানান এবং চীনের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের ভাবনা ও চীনের কাছে মানুষের প্রত্যাশার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরেন বিশেষ সংবাদদাতা ইশরাত মাহমুদ ডানা।
এসময় দৈনিক ইনকিলাবের নির্বাহী পরিচালক ও অনলাইন এডিটর ফাহিমা বাহাউদ্দীন, পরিচালক (এডমিন অ্যান্ড এইচআর) নাজিফা বাহাউদ্দীন, স্পোর্টস এডিটর রেজাউর রহমান সোহাগ, সিটি এডিটর স্টালিন সরকার, সিনিয়র সহকারী সম্পাদক মুনশী আবদুল মান্নান, সহকারী সম্পাদক উবায়দুর রহমান খান নদভী, চিফ রিপোর্টার ফারুক হোসাইনসহ সিনিয়র সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ছিলেন চীনা দূতাবাসের অ্যাটাচে লিও হংরু।
















