টানা ৭ বছর পর পিবিআইয়ের হাতে রহস্য উন্মোচন; বাবার স্বীকারোক্তিতে স্তম্ভিত তদন্তকারীরা
পরিবারের অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করায় ‘সম্মান’ পুনরুদ্ধারের নামে নিজের মেয়ে পারুল আক্তারকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন বাবা মো. কুদ্দুছ মিয়া। শুধু হত্যাই নয়, নিজের অপরাধ আড়াল করতে এবং জামাতাকে আজীবন জেলে পচাতে টানা সাত বছর চারটি তদন্ত সংস্থার বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দিয়ে মামলা লড়েছেন তিনি। অবশেষে পিবিআইয়ের (PBI) সূক্ষ্ম তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য।
২০১৫ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর এই ঘটনাটি সম্প্রতি পিবিআইয়ের প্রকাশিত একটি বইয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত আলোচনায় এসেছে। তদন্তকারীরা একে একটি ‘অনার কিলিং’ (Honor Killing) হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা বাংলাদেশে বিরল হলেও বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নির্মম হত্যাকাণ্ড:
- পালিয়ে বিয়ে: ২০১২ সালে পারুল আক্তার তাঁর প্রতিবেশী নাসির উদ্দিন বাবুকে বিয়ে করে আশুলিয়ায় সংসার শুরু করেন। পরিবারের অমতে এই বিয়ে করায় বাবা কুদ্দুছ মিয়া চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন।
- কৌশলে ডেকে আনা: তিন বছর পর ২০১৫ সালের জুলাই মাসে অভাবের সংসারে কলহের জেরে পারুল বাবার সাহায্য চাইলে কুদ্দুছ মিয়া তাকে বাড়িতে ফিরে আসতে বলেন। ১৯ জুলাই পারুল বাবার কাছে ফিরে যান।
- পরিকল্পিত খুন: ২২ জুলাই ভালো পাত্রের সাথে বিয়ে দেওয়ার নাম করে পারুলকে জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে নিয়ে যান কুদ্দুছ মিয়া। সেখানে তাঁর বন্ধু ও ভাড়াটে খুনি মোকা ডাকাতের সহযোগিতায় পারুলের হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় এবং লাশ তুলসীগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
তদন্তের গোলকধাঁধা ও বাবার ধূর্তামি: মেয়েকে হত্যার পর কুদ্দুছ মিয়া নিজেই বাদী হয়ে জামাতা নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের মামলা করেন।
- সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা: কালিহাতী থানা পুলিশ, ডিবি, সিআইডি ও পিবিআই—চারটি সংস্থা তদন্ত করে কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
- নারাজি ও জিদ: প্রতিবারই কুদ্দুছ মিয়া প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দেন এবং নতুন তদন্ত চান। এমনকি জমিজমা বিক্রি করে তিনি মামলা চালিয়ে যান যাতে জামাতাকে শাস্তি দেওয়া যায়।
যেভাবে রহস্য উন্মোচন হলো: ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পিবিআই নতুন করে তদন্ত শুরু করলে পারুলের স্বামীর করা একটি পুরনো জিডির সূত্র ধরে একটি মোবাইল নম্বরের খোঁজ পায়। সাড় সাত বছর পর সেই নম্বরটির সূত্র ধরেই বেরিয়ে আসে যে, নিখোঁজ হওয়ার আগে পারুল শেষ কথা বলেছিলেন তাঁর বাবার সাথে।
- ডিএনএ পরীক্ষা: ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই জয়পুরহাটের নদী থেকে উদ্ধার হওয়া একটি অজ্ঞাতপরিচয় নারীর লাশের সাথে পারুলের ডিএনএ মিলে গেলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেটিই পারুল।
- স্বীকারোক্তি: ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কুদ্দুছ মিয়া স্বীকার করেন যে, ‘পারিবারিক সম্মান’ রক্ষায় তিনি নিজেই মেয়েকে হত্যা করেছেন।
বর্তমান অবস্থা: বগুড়ার আদালতে বর্তমানে এই হত্যা মামলার বিচার চলছে। কুদ্দুছ মিয়া ও ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। নিরপরাধ জামাতা নাসির উদ্দিন দীর্ঘ আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
















