দেশের উত্তরাঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতেও জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি) ও র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) সরবরাহ বন্ধ আছে বহুদিন ধরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় গুদামে এসব ভ্যাকসিনের মজুত নেই বলে জানা গেছে। কুকুর ও বিড়ালের পাশাপাশি বেশ কিছু হিংস্র প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের কারণে প্রাণঘাতী এ রোগ হয়।
নওগাঁর সিভিল সার্জন মো. আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে মাত্র দুটি উপজেলায় আছে জলাতঙ্ক রোগের টিকা। পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল কালাম আজাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর ধরে এ জেলায় জলাতঙ্ক রোগের টিকার কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বগুড়াসহ কয়েকটি জেলায় স্থানীয়ভাবে কেনা হয়েছে এ রোগের সামান্য কিছু টিকা বা ভ্যাকসিন।
এ ব্যাপারে বগুড়ার মোহাম্মাদ আলী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম রনির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন অনুযায়ী ওই দুটি ভ্যাকসিন বা টিকা না দিলে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যু অবধারিত।’ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্তদের উন্নত কোনো চিকিৎসা আছে কি না–এ প্রশ্নের উত্তরে ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্তদের শতভাগই মারা যান। আর তাদের মৃত্যুও হয় খুব তাড়াতাড়ি। আক্রান্ত ব্যক্তির উন্নত কোনো চিকিৎসা নেই।’
তিনি জানান, হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের শিকার মানুষের ক্ষত স্থান যত দ্রুত সম্ভব কাপড় পরিষ্কার করার সাবান দিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ক্ষত পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষত স্থান টানা ১০ থেকে ১৫ মিনিট ট্যাপ বা টিউবওয়েল থেকে পানি দিতে হবে। প্রাণীর আক্রমণের শিকার হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব নিতে হবে চিকিৎসা কেন্দ্রে, না হলে রোগীকে জলাতঙ্ক থেকে রক্ষা করা যাবে না। কত ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিতে হবে–এ প্রশ্নের উত্তরে ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম রনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ৪৮ ঘণ্টার বেশি দেরি করা যাবে না। তখন ওই র্যাবিস ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা কাজ নাও করতে পারে।’
বগুড়ার মোহম্মাদ আলী হাসপাতালের র্যাবিস ভ্যাকসিন ইউনিট ইনচার্জ রোকসানা আখতার বলেন, ‘মাসে আমার ইউনিটে টিকা নিতে আসেন গড়ে আট হাজার মানুষ। তাদের বেশির ভাগই আসেন কুকুর ও পোষা বিড়ালের আঁচড় খেয়ে।’ তিনি জানান, পোষা কুকুর বা বিড়ালকে টিকা দেওয়া থাকলে তাদের আক্রমণে ক্ষত সৃষ্টি হলেও জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। তবে কুকুর বা বিড়ালকে টিকা দেওয়ার পর আবারও পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে টিকা প্রাণীটির শরীরে সঠিকভাবে কাজ করছে। রোকসানা আখতার জানান, এখন ওই ইউনিটে যারা টিকা নিতে আসছেন তাদের টিকা কিনতে হয়। এ ক্ষেত্রে ৫০০ টাকারও বেশি ব্যয় হয় ১ মিলিলিটার এআরভি ভ্যাকসিন কিনতে। তবে এক ভায়েল থেকে দেওয়া যায় চারজনকে। আর ৫ মিলিলিটার আরআইজি কিনতে লাগে ৯০০ টাকারও বেশি। আগে সারা দেশেই এ দুটি টিকা সবাই পেতেন বিনামূল্যে। এখন জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে সবাইকে কিনতে হচ্ছে এআরভি ও আরআইজে।
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার পার লতিফপুর গ্রামের লতিফা। এ মেয়েটিকে কুকুর কামড় দেয় গত শুক্রবার। বগুড়ায় মোহম্মাদ আলী হাসপাতালে তাকে টিকা দিতে নিয়ে আসেন তার বাবা মামুনুর রশিদ। ডিউটি নার্সকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি মামুনুর রশিদকে জানান সরকারি টিকা নেই, কারণ সরবরাহ বন্ধ আছে অনেক দিন ধরে। কী করতে হবে–এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিউটি নার্স তাকে বাজার থেকে ভ্যাকসিন কিনে আনতে বলেন। আরও কয়েকজনকে একই পরামর্শ দেওয়া হলে চারজন মিলে একটি ভায়েল কিনে আনেন ৫২০ টাকায়। তারপর সঠিক নিয়ম মেনে ভাগাভাগি করে দেওয়া হয় টিকা। একই চিকিৎসা নিতে ওই হাসপাতালে আসে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার ছাইহাটা গ্রামের দুই বছর বয়সের সাদিকা। পোষা বিড়াল তাকে আঁচড় দিয়েছে। বিড়ালটিকে টিকা দেওয়া হয়েছিল কি না, এ বিষয়টি সাদিকার মা বলতে পারেন না। তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে হাসপাতালে আনেন তার আদরের সন্তানকে। তাকেও ৫২০ টাকায় একটি ভ্যাকসিন কিনতে হয়েছে কন্যার জীবন রক্ষায়।
ঈদের দিনসহ সরকারি সব ছুটির দিনেও হাসপাতাল ও সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে এ টিকা দেওয়ার সুযোগ থাকে–এ তথ্য দিয়ে চিকিৎসকরা জানান, পোষা প্রাণীদের টিকা দেওয়ার পর তা কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হলে তাদের কামড় বা আঁচড় থেকে জলাতঙ্ক রোগ সৃষ্টি হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে বলা হয়েছে, জলাতঙ্ক রোগ থেকে বাঁচতে বছরে ভ্যাকসিন নেন গড়ে অন্তত চার লাখ মানুষ। ২০২৪ সালে এ রোগে মারা যান ৫৬ জন। তবে গত বছর মারা গেছেন ৪০ জন, যদিও প্রায় ১০০ জনের মৃত্যুর দাবি করেছেন অনেকেই। ২০২০ সালে জলাতঙ্ক রোগের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পর এ রোগে মৃত্যুর হার অন্তত ৭০ শতাংশ কমেছে বলে এ রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
















