২০২৬ সালের ১ মার্চের প্রধান খবরগুলো অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত কেবল ওই অঞ্চলের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ বা সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি বড় ঝুঁকি প্রকট হয়ে উঠবে।
১. আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সেঞ্চুরি পাসের শঙ্কা
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৭ থেকে ৭৪ ডলারের মধ্যে থাকলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়লে এই দাম ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
- প্রভাব: বাংলাদেশের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তেলের দাম বাড়লে কৃষি (সেচ), গণপরিবহন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
- বিকল্প রুট: বাংলাদেশ বর্তমানে বিকল্প হিসেবে ফুজাইরাহ টার্মিনাল ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখলেও বৈশ্বিক দাম বাড়লে তা থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন হবে।
২. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তীব্র চাপ
জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের প্রতি মাসে গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়।
- আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি: তেলের দাম বাড়লে এবং জাহাজ চলাচলে বীমা ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হলে এই বিল কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
- রিজার্ভ সংকট: ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের পর দেশের রিজার্ভ এমনিতেই চাপের মুখে আছে। নতুন করে আমদানির বাড়তি খরচ জোগাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
৩. এলএনজি ও জ্বালানি সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়া
বাংলাদেশ তার এলএনজির প্রায় সিংহভাগ আমদানি করে কাতার ও ওমান থেকে, যা মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে দেশে আসে।
- গ্যাস সংকট: ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে কাতার থেকে এলএনজি আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে দেশে চরম গ্যাস সংকট দেখা দেবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কলকারখানার চাকা থামিয়ে দিতে পারে।
- রপ্তানিতে ধাক্কা: জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং যাতায়াতের সময় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানিতে খরচ বাড়বে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এক নজরে সংঘাতের প্রভাব (সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী)
| ঝুঁকির খাত | বর্তমান অবস্থা | দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব |
| জ্বালানি তেল | জুন পর্যন্ত আমদানির চুক্তি সম্পন্ন। | দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। |
| এলএনজি | কাতার ও ওমানের ওপর নির্ভরশীল। | হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে আমদানি প্রায় অসম্ভব। |
| রিজার্ভ | ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। | আমদানি বিল বৃদ্ধিতে রিজার্ভে নতুন সংকট। |
| মূল্যস্ফীতি | সহনীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা চলছে। | তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। |
বর্তমান পরিস্থিতি: ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
গতকাল শনিবার সকালে তেহরানসহ ইরানের ২৪টি প্রদেশে প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে মিনাব শহরের একটি স্কুলে ৮৫ শিক্ষার্থীসহ ২০১ জন নিহত হয়েছেন। জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার যদি এখনই বিকল্প উৎস (যেমন আফ্রিকা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর না দেয়, তবে এই সংঘাত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আপনি কি বিশেষ কোনো খাতের (যেমন পোশাক শিল্প বা কৃষি) ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চান? আমি সাহায্য করতে পারি।
















