নাইজেরিয়ার ক্বারা রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের গ্রাম ওরো এখন মৃত্যু আর ধ্বংসের প্রতীক। কয়েক দিন আগে সশস্ত্র হামলায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হওয়ার পর পুরো জনপদ কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলাকারীরা বহু নারী ও শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে, যাদের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি।
গ্রামের কেন্দ্রস্থলে পুড়ে যাওয়া একটি ছোট দোকানের সামনে বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন উমারু টাংকো। ভেতরে পড়ে আছে তার বন্ধুর ছেলে ও নাতির পোড়া মরদেহ। আগুনে এতটাই দগ্ধ যে চেনার উপায় নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাইরে থেকে দোকানটি আটকে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, ফলে ভেতরে থাকা মানুষগুলো বেরোতে পারেননি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওরো ও পাশের একটি জনপদে একযোগে হামলা চালানো হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও যানবাহনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। তিন দিন পরও গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় আগুনের ধোঁয়া উঠছিল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে পোড়া টিন, গৃহস্থালির জিনিসপত্র আর ধ্বংসের চিহ্ন।
এক সময় প্রায় ১৭ হাজার মানুষের বসবাস ছিল ওরোতে। হামলার পর স্থানীয়দের ধারণা, এখন সেখানে ২০০ জনেরও কম মানুষ রয়ে গেছে। অধিকাংশ বাসিন্দা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে গেছে। শুক্রবার জুমার নামাজে মসজিদ ছিল প্রায় ফাঁকা, যেখানে আগে জায়গা পাওয়া কঠিন হতো।
স্থানীয় কবরস্থানে একের পর এক গণকবর খোঁড়া হয়েছে। মোহাম্মদ আবদুলকরিম জানান, একটি বড় কবরে একসঙ্গে ১২০ জনকে দাফন করা হয়েছে। আলাদা করে দাফনের মতো শক্তি বা সামর্থ্য তাদের ছিল না। একই কবরস্থানে আরও ২৩ জন খ্রিষ্টান নিহতকেও দাফন করা হয়েছে, আর কিছু মরদেহ নেওয়া হয়েছে আশপাশের গ্রামে।
হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আতঙ্ক তৈরি করেছে নারী ও শিশুদের অপহরণ। বাসিন্দারা জানান, হামলার সময় ডজনখানেক নারী ও শিশুকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, কেউ জানে না।
গ্রামবাসীদের দাবি, হামলার কয়েক দিন আগে সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী ওরোতে তাদের মতবাদ প্রচারের অনুমতি চেয়েছিল। গ্রাম কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করলে হামলা চালানো হয়। যদিও কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি, স্থানীয়রা মনে করেন আইএসআইএল সংশ্লিষ্ট একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই নৃশংসতার পেছনে রয়েছে।
হামলার পর প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ তিনুবু নিরাপত্তা বাহিনীকে হামলাকারীদের ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এলাকায়। সেনা কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে এলাকা স্থিতিশীল করা, এরপর হামলাকারীদের অনুসরণ করে অভিযানে যাওয়াই তাদের লক্ষ্য।
তবে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও স্থানীয়দের মনে ভয় কাটেনি। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা ওরো এখন এক ভূতুড়ে গ্রাম। যারা পালিয়ে গেছে, তারা কবে ফিরবে তা অনিশ্চিত। আর যারা রয়ে গেছে, তারা প্রিয়জনের শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছে—এই জনপদ আবার কখন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, সেই আশায়।
















