নিউইয়র্ক পুলিশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া এক সাহসী কর্মকর্তার নাম ফ্র্যাঙ্ক সার্পিকো। ১৯৭১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করার পর মাদকবিরোধী অভিযানের সময় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। তার পরের বছরই তদন্তে উঠে আসে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা ব্যাপক দুর্নীতির চিত্র।
এই বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয় ১৯৭৩ সালের আলোচিত অপরাধভিত্তিক চলচ্চিত্র সার্পিকো। আদর্শবাদী পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায় অভিনয় করেন আল পাচিনো। ছবিটি তৈরি হয় সাংবাদিক পিটার মাসের লেখা তথ্যভিত্তিক গ্রন্থ অবলম্বনে।
ইতালীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান সার্পিকো ১৯৫৯ সালে নিউইয়র্ক পুলিশে যোগ দেন সমাজের সেবা করার লক্ষ্য নিয়ে। ১৯৬৫ সালে সাদা পোশাকে দায়িত্ব পান, যা ছিল গোয়েন্দা হওয়ার পথে একটি ধাপ। কিন্তু দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, বিভাগের ভেতরে দুর্নীতি গভীরভাবে প্রোথিত। জুয়া ও অবৈধ কার্যক্রম থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করতেন অনেক কর্মকর্তা, যার একটি অংশ যেত ঊর্ধ্বতনদের কাছে।
১৯৬৭ সালে তিনি এই দুর্নীতির প্রমাণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেন। এর ফল হিসেবে তাকে হুমকি ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। পরে আরেক পুলিশ কর্মকর্তা ডেভিড ডার্ক তার সঙ্গে যুক্ত হন। দুজনের ব্যক্তিত্ব ছিল ভিন্ন, যা সার্পিকোর সহকর্মীদের মধ্যে আরও অপ্রিয় করে তোলে তাকে।
১৯৭০ সালে হতাশ হয়ে তারা বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এতে শহরজুড়ে তোলপাড় শুরু হয় এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তবে সার্পিকো তখনও দায়িত্বে ছিলেন।
পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রুকলিনে একটি অভিযানে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। অভিযোগ রয়েছে, সহকর্মীরা তাকে আহত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় এক বাসিন্দার সহায়তায় হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। এই ঘটনায় তার এক কানে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়।
তদন্ত কমিশনের শুনানিতে সার্পিকো বলেন, দুর্নীতি জানাতে গিয়ে তিনি বছরের পর বছর মানসিক চাপ ও একঘরে হওয়ার শিকার হয়েছেন। তিনি দাবি জানান, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে অসৎ পুলিশ সৎ পুলিশকে ভয় পাবে, উল্টোটা নয়।
তদন্তে দেখা যায়, নিউইয়র্ক পুলিশে দুর্নীতি ছিল ব্যাপক, যদিও সবার মধ্যে সমানভাবে নয়। অধিকাংশ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ছোটখাটো সুবিধা নিতেন, আবার অল্পসংখ্যক বড় অঙ্কের অপরাধে জড়িত ছিলেন।
এই কমিশন পুরনো ধারণা ভেঙে দেয় যে, দুর্নীতি শুধু কয়েকজন খারাপ মানুষের সমস্যা। বরং এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি।
১৯৭২ সালে হতাশ হয়ে সার্পিকো পুলিশ বাহিনী ছেড়ে দেন এবং কিছুদিন সুইজারল্যান্ডে বসবাস করেন। এক বছর পর তার জীবনের গল্প নিয়ে মুক্তি পায় চলচ্চিত্রটি। ছবির পোস্টারে লেখা ছিল, সহকর্মীদের চোখে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ, কারণ তিনি ছিলেন একজন সৎ পুলিশ।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট তাকে দেশটির চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।















