ঢাকা, বাংলাদেশ — আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কোন প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, তা নিয়ে বিভাজন ক্রমেই গভীর হচ্ছে, যা নির্বাচনী প্রস্তুতিকে ব্যাহত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
রোববার বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাঁরা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
একই দিনে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে আরেক দফা সমালোচনা আসে ভিন্ন রাজনৈতিক শিবির থেকে। ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত আন্দোলন থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিএনপির পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তোলে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সাজিব ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে দলের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে এবং প্রয়োজনে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকরা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। মনোনয়নপত্র যাচাই ও পরবর্তী নয় দিনের আপিল প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অভিযোগ ওঠা ২৫ জন প্রার্থীর বিষয় পর্যালোচনা করে। এর মধ্যে ২৩ জনের প্রার্থিতা বহাল রাখা হয় এবং দুজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা হলফনামা বা নথি জমা দিয়ে জানান যে তাঁরা বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন অথবা ত্যাগের জন্য আবেদন করেছেন। এসব ব্যাখ্যা গ্রহণ করেই নির্বাচন কমিশন অধিকাংশ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষণা করে।
এই সিদ্ধান্তে প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই কমবেশি লাভবান হয়েছে। অনুমোদিত ২৩ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন বিএনপির, চারজন জামায়াতে ইসলামীর এবং একজন এনসিপির প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়া জামায়াত ও এনসিপির জোটসঙ্গী খেলাফত মজলিসের একজন প্রার্থীর মনোনয়নও বহাল থাকে। বাকি সাতজন ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী।
তবে এনসিপি জানায়, তাদের যে প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ ছিল, তিনি বিষয়টি আগে দলকে জানাননি। পরে দলটি তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে অংশ নেওয়া এনসিপি নেতা মাহবুব আলম বলেন, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই কেবল ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা সংবিধানবিরোধী ও পক্ষপাতমূলক আচরণ। তাঁর মতে, এতে কিছু দল বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, কমিশনের লক্ষ্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তাঁর ভাষায়, কোনো সিদ্ধান্ত পক্ষপাতের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারান। তবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এই প্রশ্নে যে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে কি না, নাকি ত্যাগের আবেদন করলেই যথেষ্ট।
সমালোচকদের মতে, কেবল হলফনামা বা মৌখিক আশ্বাস গ্রহণ করলে সংবিধানের সুরক্ষা দুর্বল হয় এবং আইন প্রয়োগে বৈষম্য তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের নিয়ম তুলে ধরে বলা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব বহাল থাকে।
নির্বাচন কমিশন এখনো পৃথক পৃথক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত আইনি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে অতীতে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে প্রার্থিতা বাতিলের নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাম্মী আহমেদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
রোববার সন্ধ্যায় বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও পৌঁছায়। জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দল দলীয় আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বৈঠকের পর জামায়াত নেতারা নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তোলেন।
পরদিন এনসিপির প্রতিনিধি দলও ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপির চাপে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ করে। এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন।
তিনি জানান, দলটি আদালতে যাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে রাজপথে নামার কথাও বিবেচনা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া শুধু সংবিধানবিরোধী নয়, নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। আরেক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক যদি দ্রুত নিরসন না হয়, তবে আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের বৈধতা নিয়েই বড় প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
















