ঢাকা, ১২ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন এক নতুন ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবার নজর দিচ্ছে স্থলভাগের গ্যাস ব্লকগুলোর দিকে—যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য নতুন প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (PSC) বা গ্যাস উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি প্রায় প্রস্তুত।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব, বৈদেশিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক জ্বালানি প্রতিযোগিতার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাগরে ব্যর্থতা, স্থলভাগে নতুন আশার সন্ধান বিগত এক দশকে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বাংলাদেশ এখন স্থলভাগে নতুন করে তেল-গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নিচ্ছে। পেট্রোবাংলার সূত্র বলছে, দেশীয় উৎপাদন ২,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক গ্যাস সরবরাহে থেমে গেছে, অথচ চাহিদা আরও অন্তত ২৫ শতাংশ বেশি। এলএনজি আমদানি বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এই অবস্থায় সরকার স্থলভাগে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে PSC চুক্তি করে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিচ্ছে। নতুন PSC অনুযায়ী, গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Brent Crude) মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে—একটি গতিশীল প্রাইসিং সিস্টেম, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে লাভজনক হলেও, দেশীয় অর্থনীতিতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চ দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে জ্বালানি প্রতিযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ভারত, মিয়ানমার ও চীন—এই তিন দেশের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশের গ্যাস ব্লকগুলো তাদের দক্ষিণ এশীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। চীন ইতোমধ্যেই মিয়ানমারে পাইপলাইন স্থাপন করেছে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা জড়িয়ে আছে।
- ভারতের জন্য, বাংলাদেশের গ্যাস ব্লকগুলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত।
- আর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর, বিশেষ করে শেভরনের, আগ্রহ মূলত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ চেইনের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা।
এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের অনশোর ব্লকগুলো বিদেশিদের হাতে ইজারা দেওয়া শুধু অর্থনৈতিক চুক্তি নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের জ্বালানি কূটনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।
অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভারসাম্য নতুন PSC অনুযায়ী যদি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার হয়, তবে এক হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম দাঁড়াবে প্রায় ৮.৫ ডলার—যা বর্তমান দেশের অভ্যন্তরীণ ক্রয়মূল্যের (আড়াই–তিন ডলার) চেয়ে প্রায় তিনগুণ। এর ফলে স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, বিশেষ করে সার, বিদ্যুৎ ও টেক্সটাইল খাতে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি “জ্বালানি আমদানি নির্ভরতার নতুন রূপ” তৈরি করবে—যেখানে গ্যাস দেশেই উৎপাদিত হলেও, তার মূল্য নির্ধারিত হবে বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভর করে।
অন্যদিকে, সরকারের যুক্তি হলো, দেশীয় অনুসন্ধানে (বিশেষত বাপেক্সের মাধ্যমে) কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় এখন বিদেশি বিনিয়োগই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত দিক: জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা প্রশ্নে উদ্বেগ অর্থনৈতিক বিষয় ছাড়াও, বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপে নিরাপত্তা দিক নিয়েও সতর্ক করছেন। স্থলভাগে নতুন অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে, বিশেষত সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় অবস্থিত যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। এলাকাগুলোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ”, এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এ ধরনের প্রকল্পে সামরিক ও বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয় অপরিহার্য।
ভারসাম্যের রাজনীতি বাংলাদেশ এখন এমন এক সঙ্কটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে জ্বালানি ঘাটতি পূরণ, বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা এবং সার্বভৌম সম্পদের নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
স্থলভাগে বিদেশিদের অংশগ্রহণ দেশকে স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগ এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি জ্বালানি নীতি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে জাতীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন উত্থাপন করবে।
একজন জ্বালানি নীতি বিশ্লেষক বলেন,
“বাংলাদেশ যদি বাপেক্সকে শক্তিশালী করে সমান্তরালভাবে দেশীয় অনুসন্ধান চালাতে না পারে, তাহলে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা তার জ্বালানি ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।”
বাংলাদেশ কি বিদেশি বিনিয়োগের পথে গিয়ে তার গ্যাস অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে, নাকি নিজস্ব সক্ষমতার উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে? এই উত্তরের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের দিকনির্দেশনা।
















