শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট থেকে ক্ষতিকর পরামর্শ ঠেকাতে নতুন কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে চীন। প্রস্তাবিত এই নিয়মের আওতায় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে তাদের প্রযুক্তি শিশুদের আত্মহানি বা সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে এমন পরামর্শ না দেয়।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, এআই সিস্টেম যেন জুয়া উৎসাহিত করে এমন কোনো কনটেন্ট তৈরি বা ছড়াতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সম্প্রতি চীনসহ বিশ্বজুড়ে দ্রুতগতিতে নতুন চ্যাটবট চালু হওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীনের সাইবারস্পেস প্রশাসন সপ্তাহান্তে প্রকাশিত খসড়া নির্দেশিকায় জানিয়েছে, নিয়মগুলো চূড়ান্ত হলে দেশটির সব এআই পণ্য ও সেবার ওপর প্রযোজ্য হবে। এতে দ্রুত সম্প্রসারিত এই প্রযুক্তিখাতকে নিয়ন্ত্রণের বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে চলতি বছর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার পর।
খসড়া নীতিমালায় শিশুদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে এআই কোম্পানিগুলোকে শিশু ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা সেটিংস চালু করা, ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ এবং আবেগগত সঙ্গ দেওয়ার মতো সেবা দেওয়ার আগে অভিভাবকের সম্মতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আত্মহানি বা আত্মহত্যা সংক্রান্ত আলোচনার ক্ষেত্রে চ্যাটবটের পরিবর্তে অবশ্যই একজন মানুষকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারীর অভিভাবক বা জরুরি যোগাযোগ ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো বাধ্যতামূলক হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, এআই সেবার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে, জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থের ক্ষতি করে বা জাতীয় ঐক্য দুর্বল করে এমন কোনো কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার করা যাবে না।
চীনের সাইবারস্পেস প্রশাসন নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য শর্তে এআই ব্যবহারে উৎসাহও দিয়েছে। যেমন স্থানীয় সংস্কৃতি প্রচার বা বয়স্কদের সঙ্গ দেওয়ার মতো কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। খসড়া নীতিমালার বিষয়ে জনমতও আহ্বান করা হয়েছে।
চলতি বছর চীনা এআই প্রতিষ্ঠান ডিপসিক বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে, যখন তাদের অ্যাপ ডাউনলোডের তালিকায় শীর্ষে উঠে যায়। একই সঙ্গে জেড ডট এআই এবং মিনিম্যাক্স নামের দুটি চীনা স্টার্টআপ, যাদের ব্যবহারকারী সংখ্যা মিলিয়ে কয়েক কোটি, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
অনেক ব্যবহারকারী সঙ্গ বা মানসিক সহায়তার জন্য এআই চ্যাটবট ব্যবহার করায় এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মানুষের আচরণের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরদারি বেড়েছে।
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যানও স্বীকার করেছেন, আত্মহানি সংক্রান্ত আলোচনায় চ্যাটবটের প্রতিক্রিয়া ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি পরিবার তাদের ১৬ বছর বয়সী সন্তানের মৃত্যুর জন্য ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগে বলা হয়, চ্যাটজিপিটি তাকে আত্মহত্যায় উৎসাহিত করেছিল। এটি ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ভুল মৃত্যুর অভিযোগে প্রথম আইনি পদক্ষেপ।
এই মাসে ওপেনএআই মানসিক স্বাস্থ্য ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় একজন প্রস্তুতি প্রধান নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেয়। ওই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন এআই ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের নতুন এই উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী এআই নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে।
















