ওয়াশিংটন, ডিসি—দুই বছর কেটে গেছে। তবু আমেরিকান সাংবাদিক ডিলান কলিন্সের মনে এখনও একই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—দক্ষিণ লেবাননে ২০২৩ সালের যে ডাবল-ট্যাপ হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন এবং রয়টার্সের ভিডিও সাংবাদিক ইস্সাম আবদাল্লাহ নিহত হয়েছিলেন, সেই গুলিটি কার আঙুল থেকে ছুটেছিল? কার আদেশে সেই আগুন বর্ষিত হয়েছিল?
উত্তর নেই। ইসরায়েল এখনো জানায়নি—কেন স্পষ্ট পরিচয়যুক্ত সাংবাদিকদের ওপর ট্যাংকের গোলা ছোড়া হয়েছিল, কেন তাদের দিকে দুই দফা হামলা চালানো হলো। আর এই নীরবতার বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যরা, প্রেস ফ্রিডম অ্যাডভোকেটরা এবং কলিন্স নিজে দাঁড়ালেন মার্কিন ক্যাপিটলের সামনে—ন্যায়বিচারের দাবিতে।
সেনেটর পিটার ওয়েলচ, কংগ্রেসওমেন বেকা বেলিন্ট এবং সেনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন—তিনজনই ঘোষণা দিলেন, তারা ইস্সাম আবদাল্লাহর মৃত্যুর বিচার এবং ছয়জন সাংবাদিককে আহত করা ওই হামলার তদন্তের দাবি থেকে পিছু হটবেন না। “যত বাধাই আসুক, আমরা থামছি না,” বেলিন্ট বলেন।
ওয়েলচ জানান, তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে সপ্তমবারের মতো চিঠি পাঠাচ্ছেন, কারণ ইসরায়েলের দাবি—তারা নাকি তদন্ত করেছে—কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোনো প্রমাণ নেই যে সৈন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, এমনকি হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেনি ইসরায়েল।
আরও বিস্ময়কর—ইসরায়েল একদিকে বলছে তদন্ত শেষ, আবার অক্টোবরে এএফপি-কে জানিয়েছে, তদন্ত নাকি ‘চলমান’। ওয়েলচের ভাষায়, “এটা তদন্ত নয়, এটা কেবল সময়ক্ষেপণ।”
ডাবল-ট্যাপ হামলার নির্মমতা স্মরণ করে কলিন্স বলেন, “আমরা ভাবছিলাম দৃশ্যমান থাকা আমাদের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে আমাদের দুই দফা গোলা ছোড়া হলো। প্রথম গোলায় ইস্সাম সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। দ্বিতীয় গোলায় আমি শার্পনেলে জখম হই।”
তিনি বলেন, সেই দিনের বর্বরতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়। একই ধরনের ডাবল-ট্যাপ আক্রমণ বহুবার চালানো হয়েছে—গাজাতেও।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মরিস টিডবাল-বিন্জ ২০২৩ সালের ওই হামলাকে ‘পরিকল্পিত, লক্ষ্যভেদী এবং যুদ্ধাপরাধ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
তবুও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রায় নীরব। হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক আহত হওয়া সত্ত্বেও বাইডেন প্রশাসন বা ট্রাম্প প্রশাসন—কেউই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কলিন্স অভিযোগ করেন, “ওয়াশিংটনে আমি সাহায্য চাইতে গিয়েছিলাম, ভিডিও দেখিয়েছিলাম—কিন্তু দুই বছর ধরে শুধু নীরবতা পেয়েছি।”
ইসরায়েল গত দুই বছরে গাজায় তার যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সামরিক সহায়তা পেয়েছে—আর এই সহায়তার আড়ালে সাংবাদিক হত্যার ইতিহাস দীর্ঘ হয়েছে।
সিপিজের অ্যাডভোকেসি পরিচালক অ্যামেলিয়া ইভান্স বলেন, ইসরায়েলের তথাকথিত তদন্ত কেবল বাহিনীগুলোকে দায়মুক্তি দিতে। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে আহ্বান করেন—ইস্সাম আবদাল্লাহসহ সকল সাংবাদিক হত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াতে।
তবে কলিন্সের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি কাঁপন ছিল যখন তিনি তাঁর সহকর্মী ইস্সামের কথা বললেন। “ইস্সাম ছিল লেবাননের সাংবাদিকতাজগতের প্রাণ। সবসময় প্রথমে সাহায্য করতে ছুটে যেত। তার মৃত্যু সবার মনে ঠাণ্ডা ভয় ঢেলে দিয়েছিল।”
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধে লেবাননের সীমান্ত এলাকার বহু শহর ধ্বংস হয়ে যায়, আর পরে যুদ্ধবিরতির পরও পুনর্গঠন আটকে রেখেছে ইসরায়েল। কলিন্সের মতে, “যদি উদ্দেশ্য থাকে সাংবাদিকদের থামানো—তবে তা অনেকটাই সফল হয়েছে।”
সত্য উন্মোচনের পথ এখনও কঠিন, কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবি থামেনি। মার্কিন আইনপ্রণেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—যত অন্ধকারই হোক, কার গুলিতে ইস্সাম নিহত হলেন, কেন সাংবাদিকদের লক্ষ্য করা হলো—এই প্রশ্নগুলো একদিন জবাব পাবে।
















