খার্তুম, সুদান – দারফুরের রুক্ষ মাটিতে এখন আর বৃষ্টির নয়, ঝরছে রক্ত আর অশ্রু। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার প্রধান অ্যামি পোপ এক গভীর আর্তি জানিয়েছেন—একটি যুদ্ধবিরতি, একটি মানবিক করিডোর, যাতে অন্তত আটকে পড়া সাধারণ মানুষগুলো বাঁচতে পারে।
গত মাসে আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) উত্তর দারফুরের শহর এল ফাশের দখল নেওয়ার পর থেকে হাজারো মানুষ সেখানে আটকা পড়েছে। বুধবার আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অ্যামি পোপ বলেন, “সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন মানুষ পর্যন্ত পৌঁছানো। আমরা জানি তারা বিচ্ছিন্ন, সাহায্য থেকে বঞ্চিত, অথচ প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি।”
তিনি আরও বলেন, “যখন মানবিক কর্মীরাই নিহত হচ্ছেন, গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন, আটক হচ্ছেন—তখন মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই যুদ্ধবিরতি ও নিরাপদ করিডোর ছাড়া বাঁচার কোনো পথ নেই।”
২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া সেনাবাহিনী ও আরএসএফের ক্ষমতার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, গত ২৬ অক্টোবর এল ফাশের দখলের সময় আরএসএফ ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়, যা একপ্রকার গণহত্যারই ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, শহরে আটকে আছে হাজারো মানুষ, আর প্রায় ৯০ হাজার লোক পালিয়ে গেছে জীবন বাঁচাতে।
অ্যামি পোপ জানান, “যারা পালাতে পেরেছেন, তারা বলছেন পথে পচে যাওয়া লাশ দেখেছেন, গুলির আঘাত এড়াতে নিজেরাই মাটি খুঁড়ে গর্ত বানিয়েছেন। ড্রোনের শব্দে শিশুদের কান বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ ভয়াবহ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন—যা ভাষায় বলা যায় না।”
তিনি বলেন, “এই ভয়াবহ কাহিনিগুলো এখনই ঘটছে, এই মুহূর্তে।”
আইওএম একদিন আগে সতর্ক করেছিল, সুদানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ভেঙে পড়ার পথে। সংস্থাটি জানিয়েছে, গুদামগুলো প্রায় খালি, ত্রাণ বহনকারী কাফেলাগুলো নিরাপত্তাহীনতায় স্থবির, আর সহায়তা পৌঁছানোর পথও বাধাগ্রস্ত। সহিংসতা ইতিমধ্যে দেশের অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে।
অক্টোবরের শেষ থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তর কর্দোফান প্রদেশে নতুন করে প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।
এদিকে জাতিসংঘ নারী সংস্থার পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা আঞ্চলিক পরিচালক আন্না মুতাভাতি জানিয়েছেন, এল ফাশের থেকে পালিয়ে আসা নারী ও কিশোরীরা শরণার্থী শিবিরগুলোতেও নিরাপদ নন।
জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “প্রতিটি পদক্ষেপ এখন ভয়াবহ ঝুঁকি—পানি আনতে যাওয়া, জ্বালানি কাঠ কুড়ানো, কিংবা খাবারের লাইনে দাঁড়ানো—সবকিছুতেই যৌন সহিংসতার আতঙ্ক।”
তার কণ্ঠে ক্রোধ ও বেদনা মিশে ছিল, যখন তিনি বলেন, “এখন যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, ধর্ষণকে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নারীর দেহ এখন সুদানে অপরাধের ময়দান হয়ে উঠেছে।”
দারফুরের আকাশে ধোঁয়া আর ক্রন্দনের মিশ্র গন্ধ। শিশুদের মুখে ক্ষুধার রেখা, মায়েদের চোখে অদৃশ্য দাগ—সেখানে মানবিকতার কোনো রং এখন আর দেখা যায় না। জাতিসংঘের আহ্বান হয়তো সেই কালো অন্ধকারে একটুখানি আলো, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আলো কি আর কখনো পৌঁছাবে সেই পুড়ে যাওয়া হৃদয়গুলোর কাছে?















