ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বৃদ্ধি ও হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা; জ্বালানি আমদানিনির্ভর ঢাকায় মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ সংকটের নতুন শঙ্কা
যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি বা ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি দেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত। ইরান ঘিরে চলমান বর্তমান সংঘাত সেই রূঢ় বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৬৭ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার সংকেত দিচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার মার্চ মাসের জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে, তবে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয়, সেখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই তার প্রতিধ্বনি শোনা যাবে ঢাকার ডলার বাজার থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দামেও।
বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের ডিজেল, অকটেন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় সরাসরি বেড়ে যায়। এর ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ও ত্বরান্বিত হয়। সরকার তখন দুটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে—হয় ভর্তুকি বাড়িয়ে রাজস্ব ঘাটতি বাড়ানো, অথবা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ চাপিয়ে দেওয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি নতুন এক অগ্নিপরীক্ষা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিল পরিশোধে ডলারের চাহিদা বাড়বে, যা টাকার মানকে আরও দুর্বল করে রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ তেহরানের আকাশে ওড়া ক্ষেপণাস্ত্রের অর্থনৈতিক আঘাত শেষ পর্যন্ত ঢাকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রতিফলিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জ্বালানি ছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনীতির আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ—রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত এই যুদ্ধের প্রভাবে সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও আয় এই আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, যদি এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থবিরতা নিয়ে আসে, তবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের ওপর বড় আঘাত হানবে। এছাড়া লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে শিপিং খরচ এবং পণ্য পরিবহনের সময় বেড়ে যাওয়াও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক খরচে বড় প্রভাব ফেলবে। এই অনিশ্চয়তার সময়ে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য প্রধান অর্থনৈতিক ঢাল।
















