রণজি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়েছে জম্মু ও কাশ্মীর। ভারতের ঘরোয়া প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরে এই প্রথম শিরোপা জিতল তারা—যা শুধু ক্রীড়া সাফল্য নয়, বহু দশকের অপেক্ষার পর মূলধারায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান
১৯৫৯-৬০ মৌসুমে গঠিত হয় জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট সংস্থা। কিন্তু প্রথম রণজি ম্যাচ জিততে তাদের লেগে যায় ১৯৮২-৮৩ পর্যন্ত। অবকাঠামোর অভাব, প্রশিক্ষণ ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে পথচলা ছিল কঠিন।
২০১৯ সালে নয়াদিল্লি অঞ্চলটির স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে একে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেয়—যা দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের চূড়ান্ত রূপ। তবু ক্রিকেটের প্রতি আবেগ কখনো ম্লান হয়নি।
শিরোপার পথে
নকআউটে উঠেই সাতবারের চ্যাম্পিয়ন দিল্লিকে হারায় জম্মু ও কাশ্মীর। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে মধ্যপ্রদেশ, সেমিফাইনালে বাংলা—সবাইকে পেছনে ফেলে ফাইনালে মুখোমুখি হয় আটবারের চ্যাম্পিয়ন কর্নাটকের।
কর্নাটক দলে ছিলেন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও। তবু দৃঢ়তা ও নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সে তাদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো রণজি ট্রফি জিতে নেয় জম্মু ও কাশ্মীর।
পরিবর্তনের তিন মোড়
গত ১৫ বছরে দলটির উত্থানের পেছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে—
প্রথম মোড় (২০১১-১৩): সাবেক ভারত অধিনায়ক বিষেণ সিং বেদি কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস জোগান—বড় দলের সামনে ভয় না পেয়ে সমানতালে লড়ার মানসিকতা গড়ে তোলেন।
দ্বিতীয় মোড় (২০১৮-১৯): সাবেক অলরাউন্ডার ইরফান পাঠান খেলোয়াড়-পরামর্শক হিসেবে যোগ দেন। আঞ্চলিক বিভাজন ভুলে এক দল হিসেবে খেলার বার্তা দেন। এই সময়ে উঠে আসেন আবদুল সামাদ ও উমরান মালিকের মতো প্রতিভা।
তৃতীয় মোড় (প্রায় পাঁচ বছর আগে): প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি শীর্ষ পরিষদ গঠিত হয়। আধুনিক প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক ফিটনেস ও পেশাদার কাঠামো গড়ে ওঠে। অভিজ্ঞ ব্যাটার পরাস ডোগরাকে অধিনায়ক করা হয়, যিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপা জেতান।
নতুন তারকার উত্থান
দলের প্রধান শক্তি ছিলেন পেসার আকিব নবী—মৌসুমে ৬০ উইকেট নেন তিনি। আগের মৌসুমেও নিয়েছিলেন ৪৪ উইকেট। অনেকের মতে, তিনি জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার মতো প্রস্তুত। সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি প্রকাশ্যে তার প্রশংসা করেছেন।
কেন এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ
এই জয় দুইভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—
১. ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ক্রিকেটের বিস্তার কত গভীর, তা প্রমাণ করে।
২. দীর্ঘদিন অস্থিরতায় থাকা একটি অঞ্চলকে জাতীয় গর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়।
জম্মু ও কাশ্মীরের এই উত্থান অনেকের কাছে আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্রুত অগ্রগতির স্মৃতি জাগায়। তবে এখানে সাফল্য এসেছে ধীরে, ধাপে ধাপে, কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
এই শিরোপা শুধু একটি ট্রফি নয়—এটি আত্মবিশ্বাস, স্বীকৃতি ও মূলধারায় দৃঢ় অবস্থান তৈরির প্রতীক।
















