মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বিস্তৃত এই সংঘাত শুরু হয় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শনিবার ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন বলে তেহরান নিশ্চিত করে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণকে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় একাধিক দেশ ও মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করলে ইসরায়েল বৈরুতে পাল্টা হামলা চালায়।
কেন হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল?
ট্রাম্প বলেছেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো “ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা”। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার ঘোষণাও দেন। যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে “অপারেশন এপিক ফিউরি”।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরান “অস্তিত্বগত হুমকি” তৈরি করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ইরানের নিরাপত্তা অবকাঠামো ভেঙে দিতে চায়।
ইরান বরাবরই দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তারা হামলাকে “অবৈধ ও উসকানিমূলক” বলে অভিহিত করেছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কী?
ইরান ইসরায়েল ছাড়াও কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতেও ড্রোন আঘাত হানে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কুয়েতে মার্কিন বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যদিও সেটি ‘বন্ধুসুলভ গুলিবর্ষণ’ বলে দাবি করা হয়েছে। কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন।
ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো খালি করার নির্দেশ দিয়েছে।
অর্থনীতি ও জ্বালানিতে প্রভাব
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর আংশিক উৎপাদন বন্ধ হয়।
বিশ্বের প্রায় ২০% তেল ও গ্যাস সরবরাহ যে প্রণালী দিয়ে যায়—হরমুজ প্রণালী—সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ১০% বেড়েছে।
ইরানে নেতৃত্ব পরিবর্তন
খামেনির মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান ও একজন জ্যেষ্ঠ আলেম। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে ৮৮ সদস্যের বিশেষ পরিষদ। চলমান হামলার কারণে প্রক্রিয়াটি জটিল হতে পারে।
যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে?
ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান “চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ” একই গতিতে চলতে পারে, তবে প্রয়োজন হলে আরও দীর্ঘ হতে পারে। নেতানিয়াহুও বলেছেন, “যতদিন প্রয়োজন” অভিযান চলবে।
আকাশপথ বন্ধ হওয়ায় হাজারো ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। দুবাই, দোহা ও অন্যান্য শহরে বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে।
সামনে কী?
এই সংঘাত এখন আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো ও বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ ঝুঁকিতে থাকায় এর প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক সমাধান, সামরিক সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর। তবে আপাতত সংঘাতের দ্রুত অবসানের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
















