প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ ফ্লুতে আক্রান্ত হন। জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও কাশিতে অনেকেরই এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ভোগান্তি হয়। বছরে আনুমানিক ২ লাখ ৯০ হাজার থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। তবু মৌসুমি টিকা প্রতিবছর নতুন করে নিতে হয়—কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ক্রমাগত রূপ বদলায়।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Nicholas Heaton বলেন, এ কারণেই প্রতিবছর ফ্লু টিকা প্রয়োজন। তবে বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা এমন একটি “সর্বজনীন” টিকার সন্ধানে কাজ করছেন, যা বহু ধরনের ফ্লু স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে পারে।
কেন প্রতিবছর টিকা বদলাতে হয়?
ফ্লু ভাইরাসের পৃষ্ঠে থাকা হেমাগ্লুটিনিন ও নিউরামিনিডেজ নামের প্রোটিন দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এদের ১৮ ও ১১টি ভিন্ন রূপ রয়েছে, যা মিলেমিশে বিভিন্ন উপপ্রকার তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের জন্য আলাদা সুপারিশ দেয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনুমান সবসময় সঠিক হয় না।
২০২৫–২৬ মৌসুমে উদাহরণ হিসেবে এইচ৩এন২–এর একটি নতুন উপশাখা ছড়িয়ে পড়ে, যা আগে সুপারিশ তালিকায় ছিল না। তবু প্রাথমিক তথ্য বলছে, টিকা গুরুতর অসুস্থতা কমাতে সহায়ক হয়েছে।
ভাইরাসের ‘দুর্বল জায়গা’ লক্ষ্য করে নতুন কৌশল
নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই মেডিকেল স্কুলের গবেষক Florian Krammer হেমাগ্লুটিনিন প্রোটিনের এমন একটি অংশকে লক্ষ্য করছেন, যা তুলনামূলক স্থিতিশীল। তিনি এটিকে আইসক্রিমের সঙ্গে তুলনা করেন—উপরের স্বাদ বদলালেও নিচের কন অংশ প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। তাঁর দল এমন ভ্যাকসিন প্রার্থী তৈরি করেছে, যা দেহকে সেই ‘কন’ অংশের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শেখায়।
অন্যদিকে, হিটনের দল ৮০ হাজারের বেশি ভিন্ন রূপের হেমাগ্লুটিনিন ব্যবহার করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করছে, যাতে তা পরিবর্তনশীল অংশ নয়, বরং স্থিতিশীল অংশকে লক্ষ্য করে। ২০২৪ সালে এ পদ্ধতির প্রাথমিক ইতিবাচক ফল প্রকাশিত হলেও মানবদেহে পরীক্ষা এখনো শুরু হয়নি।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা নাকের স্প্রে আকারে এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যা ফুসফুসের প্রতিরোধক কোষকে সক্রিয় রাখবে। প্রাণী পরীক্ষায় তিন মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেখা গেছে, তবে মানুষের ওপর পরীক্ষা বাকি।
অন্য দিকগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে
কিছু গবেষক নিউরামিনিডেজ প্রোটিনকে লক্ষ্য করছেন, যা তুলনামূলক ধীরে পরিবর্তিত হয়। কেউ কেউ টি-সেল সক্রিয় করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন—যা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি তৈরি করতে পারে। আবার নতুন প্রযুক্তি ও নাকের টিকা নিয়েও পরীক্ষা চলছে, যাতে ভাইরাস শরীরে ঢোকার আগেই প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
‘সর্বজনীন’ টিকা কতটা বাস্তবসম্মত?
ক্র্যামার মনে করেন, যেকোনো উপপ্রকারের ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ও বি ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব—তবে এটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। হিটন বরং “বিস্তৃত সুরক্ষাদানকারী” টিকা শব্দটি পছন্দ করেন, কারণ সম্পূর্ণ সর্বজনীন সুরক্ষা দেওয়া কঠিন।
এআই কি সমাধান দিতে পারে?
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক Regina Barzilay কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মৌসুমি টিকার জন্য উপযুক্ত স্ট্রেইন নির্বাচন উন্নত করার মডেল তৈরি করেছেন। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দাবি করা হয়, এই পদ্ধতি বিশ্লেষণে আরও নির্ভুল হতে পারে।
সামনে কী আশা?
একবার টিকা নিয়ে আজীবন নিশ্চিন্ত থাকার মতো সমাধান হয়তো এখনো দূরে। তবে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও উন্নত ও দীর্ঘস্থায়ী ফ্লু টিকা আসতে পারে—এমন আশা প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।
এরই মধ্যে মৌসুমি টিকা জীবন রক্ষা করছে। আর বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের আরও কার্যকর সুরক্ষার পথ তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
















