দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত বদলে দিয়েছে আধুনিক যুদ্ধের নিয়ম
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে ইউক্রেন হাজার হাজার ইরান-নির্মিত বা নকশাকৃত ড্রোনের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে এসব ড্রোন ভূপাতিত করার কৌশলে ইউক্রেন এখন সবচেয়ে অভিজ্ঞ দেশগুলোর একটি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করতে ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞরা সহায়তা করবে।
একই সময়ে ইউক্রেনের বড় ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউক্রস্পেকসিস্টেমস যুক্তরাজ্যের মিল্ডেনহলে কারখানা চালু করেছে, যেখানে মাসে প্রায় এক হাজার ড্রোন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান ও যুক্তরাজ্যে বর্তমান রাষ্ট্রদূত ভালেরি জালুঝনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বিপ্লব
শুরুর দিকে ধারণা ছিল, দুই সাবেক সোভিয়েত বাহিনীর লড়াই হবে পুরোনো কৌশল আর অস্ত্রে। কিন্তু চার বছরে যুদ্ধ বদলে দিয়েছে সেই ধারণা। এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীন এই যুদ্ধের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত পরিবর্তন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ড্রোন, সস্তা বাণিজ্যিক যন্ত্রাংশ, তাৎক্ষণিক সফটওয়্যার সমাধান—সব মিলিয়ে যুদ্ধ হয়েছে সস্তা, দ্রুত ও মারাত্মক। জার্মানির সশস্ত্র বাহিনীসহ ন্যাটো এই উদ্ভাবনগুলো বিশ্লেষণ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
‘ম্যাকগাইভার’ কৌশল
সংখ্যায় ও অস্ত্রে পিছিয়ে থেকেও ইউক্রেনীয় সেনারা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে পাল্টা দিয়েছে। একটি কিয়েভভিত্তিক উদ্যোগ যুদ্ধের শুরুতে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট সরবরাহ করলেও পরে সস্তা ট্যাবলেটকে আর্টিলারি নির্দেশনা যন্ত্রে রূপান্তরকারী সফটওয়্যার তৈরি করে। এতে লক্ষ্য নির্ধারণ, দূরত্ব হিসাব ও আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে গোলাবর্ষণ সংশোধন সম্ভব হয়।
রাশিয়াও দ্রুত এসব কৌশল অনুকরণ করে। ২০২৩ সালে ইউক্রেনীয় প্রকৌশলীরা ড্রোনে অপটিক ফাইবার যুক্ত করে রেডিও জ্যামিং এড়ানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রুশ বাহিনী সেটি অনুকরণ ও বিস্তৃত আকারে ব্যবহার শুরু করে।
এখন সামনের সারিতে ২৪ ঘণ্টা ড্রোনের গুঞ্জন, বড় আকারের সাঁজোয়া কনভয় আর দেখা যায় না। রুশ সেনারা ছোট দলে অগ্রসর হয়, ইন্টারনেট বা জিপিএস ছাড়াই কাজ করা টপোগ্রাফিক অ্যাপ ব্যবহার করে চলাচল করে। দুই পক্ষই তাপ-সংবেদনশীল ক্যামেরা এড়াতে বিশেষ ছদ্মবেশ ব্যবহার করছে।
সমুদ্রযুদ্ধেও বদল
২০২২ সালে ইউক্রেনের নৌবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেলেও ২০২৩ সালের মাঝামাঝি তারা সমুদ্র ড্রোন তৈরি করে। এসব ড্রোন রুশ কৃষ্ণসাগর নৌবহরের বড় জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সেভাস্তোপলের ড্রাইডক আঘাত করে। এর ফলে রাশিয়াকে জাহাজ সরিয়ে নিতে হয়।
বিশ্ব শক্তির নজর
বিশ্লেষকদের মতে, চীন ঘনিষ্ঠভাবে যুদ্ধের প্রতিটি দিক পর্যবেক্ষণ করছে। তবে স্বৈরশাসিত কাঠামোয় দ্রুত সিদ্ধান্ত বিকেন্দ্রীকরণ ও তথ্য আদানপ্রদানের মতো “সমান্তরাল অ্যালগরিদম” প্রয়োগ করা কঠিন—যা এই যুদ্ধের বড় শিক্ষা।
সব মিলিয়ে, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক সংঘাতে ড্রোন, সাইবার প্রযুক্তি ও তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনই প্রধান শক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটসহ ভবিষ্যতের যুদ্ধে এই নতুন কৌশলই প্রাধান্য পাবে বলে বিশ্লেষকদের মত।
















