রাশিয়ার একের পর এক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আবারও রক্তে রঙিন ইউক্রেনের আকাশ। কিয়েভ থেকে শুরু করে ডিনিপ্রোপেট্রোভস্ক পর্যন্ত, আগুন, ধ্বংস আর মৃত্যু যেন প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে। শনিবারের হামলায় অন্তত চারজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করে চাপ বাড়িয়ে চলেছে।
রাতভর তীব্র বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল কিয়েভ। শহরের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর টকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, দুইজন নিহত এবং অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। “রাজধানী এখনো বলিস্টিক হামলার আওতায়,” জানিয়েছেন মেয়র ভিতালি ক্লিটসকো। শহরের উত্তরে একটি গুদামঘরে আগুন ধরে যায়, আর ধ্বংসস্তূপে ছড়িয়ে থাকা ধোঁয়া যেন যুদ্ধের প্রতীক হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলে।
ডিনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলেও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ভ্লাদিস্লাভ হাইভানেঙ্কো বলেন, রুশ বাহিনীর হামলায় সেখানে দুইজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ভেঙে পড়েছে আবাসিক ভবন, দোকান, এমনকি শিশুদের খেলার জায়গাও। নিহতদের একজন ছিলেন উদ্ধারকর্মী—আরেকজন আহত সহকর্মীর পাশে দাঁড়িয়েই প্রাণ হারান তিনি, পুনরায় হামলার সময়।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া মোট নয়টি ইস্কান্দার এম বলিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬২টি আক্রমণাত্মক ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে ৫০টি ড্রোন এবং চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা সম্ভব হয়। তবু, যে ক্ষেপণাস্ত্র মাটিতে পড়ে, তার প্রতিটি টুকরোই যেন স্মরণ করিয়ে দেয় এই যুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
অন্যদিকে, রাশিয়া নিজেদের দাবি করেছে ভুক্তভোগী হিসেবে। তারা অভিযোগ করেছে, ইউক্রেন সীমান্ত সংলগ্ন বেলগোরোদ অঞ্চলের একটি বাঁধে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। গভর্নর ভিয়াচেসলাভ গ্লাদকভ টেলিগ্রামে লিখেছেন, বারবার হামলায় বাঁধের আশপাশের এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তাই মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাতভর ১২১টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
যুদ্ধের চতুর্থ শীতে বাড়ছে চাপ
যুদ্ধ যখন চতুর্থ শীতে পা রাখছে, তখনই পশ্চিমা দেশগুলো নতুন করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জ্বালানি খাতে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা মস্কোর যুদ্ধ অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাশিয়ার প্রধান তেল কোম্পানি রোসনেফট ও লুকওইল-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও একদিন পর তাদের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি নিষিদ্ধ করে, যা রাশিয়ার রাজস্বে বড় ধাক্কা।
লন্ডনে অনুষ্ঠিত “কোলিশন অব দ্য উইলিং” বৈঠকের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, “এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আমাদের জন্য নতুন আশা। কিন্তু আমাদের আরও দরকার—রাশিয়ার প্রতিটি তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সহযোগিতা।”
তিনি আরও জানান, “রাতভর এই হামলাগুলোই প্রমাণ করে কেন আমাদের ‘প্যাট্রিয়ট সিস্টেম’ প্রয়োজন। আমাদের শহরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অংশীদার দেশগুলোকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।”
পুতিনের অনমনীয়তা এবং বৈশ্বিক উদ্বেগ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পশ্চিমা চাপের সামনে নতি স্বীকার করতে নারাজ। তিনি বলেন, “কোনও সম্মানিত দেশ কখনও চাপে সিদ্ধান্ত নেয় না। এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং বৈরী।”
পুতিনের অবস্থান স্পষ্ট—ইউক্রেনের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলগুলো রাশিয়ার অংশ হিসেবেই থাকবে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের জন্য এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই দুই বিপরীত অবস্থানেই আটকে গেছে কূটনৈতিক আলোচনা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি নির্বাচনের আগে দাবি করেছিলেন যে তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই যুদ্ধ থামাতে পারবেন, তিনিও এখন ব্যর্থতার মুখে। তাঁর প্রস্তাবিত ‘যুদ্ধবিরতির রেখা’ বরাবর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার উদ্যোগও সফল হয়নি। ফলে ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক ভেস্তে গেছে।
রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ অবশ্য বলেছেন, “আমরা বিশ্বাস করি, কূটনৈতিক সমাধান এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে কাছাকাছি।” কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে রক্ত ঝরার ধারা তাতে থামছে না।
যুদ্ধের মানবিক চিত্র
এই চার বছরের দীর্ঘ সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে লাখ ছাড়িয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে কোটি মানুষ। শিশুদের চোখে আর নেই শৈশব, মায়েদের কোলে নেই নিরাপত্তা—শুধু ভাঙা ঘরবাড়ি, পোড়া মাটি আর ধোঁয়ার গন্ধে ভরে গেছে ইউক্রেনের বাতাস।
কিয়েভের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে একজন দমকলকর্মী বলছিলেন, “আমরা প্রতিদিন আগুন নেভাই, কিন্তু জানি—আগামীকাল আবার জ্বলবে।” এই কথাই হয়তো আজকের ইউক্রেনের প্রতিচ্ছবি।
বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন জোরদার হলেও, রাজনীতির দাবার ছকে সাধারণ মানুষ এখনো কেবল গুটি মাত্র। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যতই কড়া হোক, মানবিক ট্র্যাজেডির গভীরতা তাতে সামান্যই কমছে।
ইউক্রেনের শহরগুলো এখন একেকটি পোড়া ক্যানভাস—যেখানে শিল্পী আর কবিরা হারিয়ে ফেলেছেন শব্দ, কেবল আগুনের আঁচড়ে লেখা এক নিরব প্রতিবাদ।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের এই যুদ্ধ আজ শুধু ভূখণ্ডের লড়াই নয়, এটি মানবতার সহনশীলতারও পরীক্ষা। একদিকে আছে পরাশক্তির অহংকার, অন্যদিকে এক জাতির টিকে থাকার সংগ্রাম। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দে, প্রতিটি শিশুর কান্নায় এই যুদ্ধ নতুন করে ইতিহাস লিখছে—একটি এমন ইতিহাস, যেখানে জয়ী কেউ নয়, হারছে কেবল মানুষ।
















