১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় বছর পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের লক্ষ্য হলো ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলা। তবে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ও সাম্প্রতিক টানাপোড়েন সেই পথকে জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে অবনতি ঘটে। ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানির পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা হাসিনার ক্রমশ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করেছিল।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে নিয়মিত বক্তব্য দেওয়া দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে। গত নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করেনি। যদিও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, ভারত রাজনৈতিক চরিত্রের মামলায় প্রত্যর্পণ না করার অধিকার প্রয়োগ করছে।
ভারতের উদ্বেগ হলো, হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে পারে যারা ভারতের প্রতি বিরূপ। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতবিরোধী বক্তব্য, সহিংসতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করেছে। বাংলাদেশের সরকার এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। তবে এক তরুণ আন্দোলনকর্মীর হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সহিংসতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
এই টানাপোড়েনের প্রতিফলন হিসেবে ভারত সাম্প্রতিক বাজেটে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক সহায়তা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।
ভূরাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির মধ্যেই চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির অস্ত্র আমদানির বড় অংশ এসেছে চীন থেকে। তবু ভারতের আশঙ্কা, বাংলাদেশে তাদের প্রভাব কমার সুযোগে বেইজিং পরিস্থিতি কাজে লাগাতে চাইছে।
বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংলাপ ভারতকে আরও অস্বস্তিতে ফেলেছে। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন ও নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে বাংলাদেশের সহযোগিতাও নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গেও ঢাকার সম্পর্ক নতুন গতি পেয়েছে। ভিসা ও বাণিজ্য সহজীকরণ, সমুদ্রপথ চালু এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আলোচনা দুই দেশের দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমিয়েছে। এমনকি যৌথভাবে নির্মিত যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
পরিচয় রাজনীতির চ্যালেঞ্জ
ভারতের আশা, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার এলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। সে লক্ষ্যে নয়াদিল্লি রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে এবং বিরোধী দলের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুই দেশেই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশে যদি এমন সরকার আসে যারা প্রকাশ্যে ভারতের প্রতি বিরূপ বা কট্টরপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত করে, তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। এমনকি জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন সরকার এলেও সম্পর্কের উন্নতি নিশ্চিত নয়।
ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ইস্যু ঘিরে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমে আলোচনার তীব্রতা এবং সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর আসন্ন নির্বাচনও পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারে।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও সহিংসতা পরিস্থিতি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। কম ভোটার উপস্থিতি বা অস্থিরতা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে দুই দেশের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে নির্বাচন বানচালের হুমকিও উদ্বেগের কারণ।
তবু সীমান্ত, আঞ্চলিক সংযোগ ও নিরাপত্তার স্বার্থে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্থিতিশীলতা উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা শুধু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ ও ভারতের বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
















