যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তদন্তে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন–সংক্রান্ত সর্বশেষ নথি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত এই নথিপত্রের পরিমাণ ৩০ লাখ পৃষ্ঠার বেশি, যা এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সবচেয়ে বড় নথির ভাণ্ডার। এতে ভারত, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে ও স্লোভাকিয়ার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সরকারি ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে।
২০০৮ সালে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেও এপস্টেইন ফেডারেল পর্যায়ের কঠোর শাস্তি এড়িয়ে যান। পরে ২০১৯ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারের অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার হলেও বিচার শুরুর আগেই নিউইয়র্কের কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। নতুন নথিতে তাঁর অপরাধের বিস্তার এবং বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে শুধু নথিতে নাম থাকা মানেই কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়, এবং এখনো এ বিষয়ে নতুন কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিল্পপতি অনিল আম্বানির সঙ্গে এপস্টেইনের বার্তা বিনিময়ের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০৮ সালের দণ্ডের পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ ছিল বলে দেখা যায়। এসব বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ, মোদির সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর ও ইসরায়েল নীতি নিয়ে আলোচনা উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে মোদির যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সফরের পর এপস্টেইন এক ইমেইলে দাবি করেন, এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে এসেছে।
নথিতে আরও দেখা যায়, ২০১৯ সালের ভারতীয় সাধারণ নির্বাচনে মোদির বড় জয়ের পর এপস্টেইন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে মোদির সম্ভাব্য বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেন। এ বিষয়ে অনিল আম্বানির সঙ্গেও তাঁর বার্তা বিনিময়ের তথ্য রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ সরকারি অনুমোদিত ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নেই।
ভারতের আরেক রাজনীতিক হরদীপ সিং পুরির সঙ্গেও এপস্টেইনের ইমেইল যোগাযোগের তথ্য রয়েছে। নথিতে দেখা যায়, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে পুরি একাধিকবার এপস্টেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পুরি দাবি করেছেন, এসব যোগাযোগ ছিল সম্পূর্ণ পেশাগত।
ভারত সরকার এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, মোদির ২০১৭ সালের ইসরায়েল সফর ছাড়া বাকি সব মন্তব্য একজন দণ্ডিত অপরাধীর ভিত্তিহীন কথাবার্তা, যা গুরুত্ব দেওয়ার মতো নয়। তবে বিরোধী কংগ্রেস দল এসব তথ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা দাবি করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত কেভিন রাডের নামও নথিতে এসেছে। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের সময়সূচির উল্লেখ পাওয়া যায়। রাড অবশ্য এপস্টেইনের সঙ্গে কোনো বন্ধুত্ব বা সাক্ষাতের কথা অস্বীকার করেছেন।
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসনের ক্ষেত্রেও নতুন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। নথিতে দেখা যায়, তিনি ২০০৩ ও ২০০৪ সালে এপস্টেইনের কাছ থেকে অর্থ পেয়েছিলেন। এই তথ্য প্রকাশের পর তিনি ক্ষমতাসীন দলের সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং দুঃখ প্রকাশ করেন।
নরওয়ের যুবরাজ্ঞী মেত্তে-মারিতের সঙ্গে এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের যোগাযোগের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। ইমেইলগুলোতে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও ব্যক্তিগত ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। এসব প্রকাশ নরওয়ের রাজপরিবারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন যুবরাজ্ঞীর ছেলে গুরুতর অভিযোগের মুখে আদালতে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া স্লোভাকিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাইচাকের সঙ্গেও এপস্টেইনের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য সামনে আসার পর তিনি পদত্যাগ করেন, যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইন নথির এই প্রকাশ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতির নানা স্তরে প্রভাব ফেলছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।
















