যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাঁকে মনোনয়ন দিয়েছেন, সেই কেভিন ওয়ারশকে ঘিরে বিশেষজ্ঞদের মতামত ভিন্ন ভিন্ন। কেউ তাঁকে নমনীয় ও বিচক্ষণ বলছেন, আবার কেউ দেখছেন নীতিগতভাবে অবস্থান বদলাতে সক্ষম এক চরিত্র হিসেবে।
সিনেটের অনুমোদন পেলে সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর কেভিন ওয়ারশ আগামী মে মাসে বর্তমান প্রধান জেরোম পাওয়েলের স্থলাভিষিক্ত হবেন। শুক্রবার ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়ারশের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
গত এক বছরে সুদের হার কমাতে না চাওয়ায় ট্রাম্প বারবার পাওয়েলের সমালোচনা করেছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়ারশের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সঙ্গে শুরুতে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে মসৃণ হতে পারে। কারণ তিনি রিপাবলিকান ঘরানার সঙ্গে যুক্ত এবং ট্রাম্পঘনিষ্ঠ একটি পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর শ্বশুর রোনাল্ড লডার ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমর্থক।
ওয়ারশ বর্তমানে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এবং সেখানে শিক্ষকতাও করছেন। সমালোচকদের মতে, তিনি সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নিজের অবস্থান বদলাতে আগ্রহী। অতীতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হারের পক্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সুদের হার কমানোর পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন, যা ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই নমনীয়তাই তাঁকে নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এক নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, ওয়ারশ তথ্যসমৃদ্ধ ও বুদ্ধিদীপ্ত মনে হলেও তাঁর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না। তাঁর মতে, ওয়ারশের নীতিগত অবস্থান অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
পঞ্চান্ন বছর বয়সী ওয়ারশ দুই হাজার ছয় সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বোর্ডে যোগ দেন এবং বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে সে সময় তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ দেখিয়েছিলেন বলে সমালোচকদের দাবি। তখন বেকারত্ব দ্রুত বাড়লেও তিনি সেই ঝুঁকিকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেননি।
দুই হাজার সতেরো সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ শুরুর পর থেকে ওয়ারশের অবস্থান ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করে। সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে আরেকটি আর্থিক সংকট দেখা দিলে তিনি তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের বদলে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে পারেন।
তবে সবাই এই মনোনয়ন নিয়ে নেতিবাচক নন। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ওয়ারশ একজন সক্ষম ও অভিজ্ঞ প্রার্থী, যদিও তাঁকে ব্যতিক্রমী বলা যায় না। তাঁদের মতে, ওয়ারশের রেকর্ড কিছুটা রাজনৈতিক হলেও তিনি চরম সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হলেও ওয়ারশ এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। বোর্ডের অন্য সদস্যদের সম্মতি ছাড়া সুদের হার কমানো বা বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প যেভাবে সুদের হার এক শতাংশে নামানোর কথা বলছেন, তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের বড় সুদের হার কমালে মাঝামাঝি মেয়াদে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে, ডলারের মান কমে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি ও অভিবাসন দমনমূলক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। বর্তমান প্রবৃদ্ধি সহনীয় হলেও কর্মসংস্থান তেমন বাড়ছে না। এই পরিস্থিতিতে শুধু সুদের হার কমিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেই তাঁদের ধারণা।
ওয়ারশ শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁকে সিনেটের শুনানির মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে ট্রাম্পের নীতির প্রতি তাঁর অবস্থান বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে এক রিপাবলিকান সিনেটর ঘোষণা দিয়েছেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত প্রত্যাহার না করা হলে তিনি কোনো নতুন মনোনয়ন সমর্থন করবেন না।
এই তদন্তকে অনেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ট্রাম্পের আরেকটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। ফলে ওয়ারশের মনোনয়ন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
















