আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল। বাংলাদেশ দলের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আবারও দেখিয়ে দিল, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন। একই সঙ্গে এটি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা অবনতি হয়েছে, তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত।
দক্ষিণ এশিয়ায় অতীতে ক্রিকেট অনেক সময় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। এই প্রেক্ষাপটে ‘ক্রিকেট কূটনীতি’ শব্দবন্ধও চালু হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের এশিয়া কাপে ভারত ও পাকিস্তানের ম্যাচগুলোতে দুই দলের অধিনায়কের করমর্দন না করা এবং ফাইনালের পর পুরস্কার গ্রহণে ভারতের অনীহা ক্রিকেট কূটনীতির অবনতিরই প্রতিফলন ছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ক্রিকেট সম্পর্ক নতুন করে সংকটে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিকেটভক্ত জনগোষ্ঠীর দেশ বাংলাদেশ ২০২৬ সালের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে না। ভারত ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের গ্রুপপর্বের সব ম্যাচ ভারতের মাটিতে হওয়ার কথা ছিল। তবে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সরকারের সমর্থনে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের অনুরোধ করে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বাংলাদেশের এই অনুরোধ নাকচ করে দেয়। পরে ২৪ জানুয়ারি বোর্ড সভায় কাউন্সিল জানায়, ভারতে বাংলাদেশের দল, কর্মকর্তা বা সমর্থকদের জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। এর পরই বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের অবস্থানের পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে কলকাতার একটি দলকে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও ভারতে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড দাবি করে, এমন পরিস্থিতিতে ভারতে খেলতে গেলে তাদের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এক বিবৃতিতে জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং সরকারের পরামর্শে ভারতে সফর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে একাধিক দফা আলোচনার পরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তে দ্বৈত মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ এর আগে ভারত নিজেদের নিরাপত্তাজনিত যুক্তি দেখিয়ে পাকিস্তানে না গিয়ে অন্য দেশে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাচ খেলার অনুমতি পেয়েছিল। যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, অন্য কোনো দেশের পক্ষে একই ধরনের দাবি আদায় করা প্রায় অসম্ভব।
এই ঘটনাপ্রবাহ আবারও প্রমাণ করেছে, খেলাধুলা বিশেষ করে ক্রিকেট দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবেও কাজ করে। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হয়েছে, যার প্রভাব এখন ক্রিকেট অঙ্গনেও স্পষ্ট।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাকিস্তান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকিও দিয়েছে। যদিও আর্থিক ও ক্রীড়াগত ক্ষতির কারণে পাকিস্তানের পুরোপুরি সরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সব মিলিয়ে, টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে এই সংকট দেখাচ্ছে যে, এক সময়ের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারতের চারপাশের কূটনৈতিক পরিবেশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ ও প্রতিকূল হয়ে উঠেছে।
















