শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান এক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার দিকে ঝুঁকছে ঢাকা, যা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ নতুন গতি পেয়েছে। উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ঢাকা সফর, ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু, এমনকি পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকায় পাকিস্তানি পণ্ডিত ও শিল্পীদের আগমন, পাকিস্তানি ব্যবসার উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে পাকিস্তানের সমর্থন জনমনে নতুন বার্তা দিচ্ছে।
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব অতিরিক্ত ছিল বলে মনে করেন অনেকে। হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই প্রভাব থেকে সরে এসে পাকিস্তানকে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখছেন অনেক নাগরিক। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর হলেও ২০০৯ সালের পর থেকে তা অভূতপূর্ব মাত্রা পায়। তবে ২০২৪ সালের ভারতবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হাসিনা সরকারের পতন সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিবর্তিত জনমত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর জন্য সহায়ক হতে পারে, যাদের পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে ধারণা প্রচলিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের আধিপত্য ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেই এই মানসিক পরিবর্তন এসেছে। সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন এবং বিতর্কিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। হাসিনা সরকারের কঠোর দমননীতি সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত কূটনৈতিক বৈচিত্র্যের পথে হাঁটছে। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান থেকে চাল আমদানির মাধ্যমে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো সরাসরি বড় আকারের বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। ঢাকায় পাকিস্তানি ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতিও বাড়ছে।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী ও শিল্পীদের পরিবেশনা, নাটক, পোশাক ও খাবারের জনপ্রিয়তা ঢাকায় নতুন এক পরিচিতি তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদন মাধ্যমে এই আগ্রহ আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
ক্রিকেট কূটনীতিতেও পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনে নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবিতে ঢাকার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে ইসলামাবাদ। এতে অনেক বাংলাদেশি মনে করছেন, দ্বৈত মানদণ্ডের শিকার হওয়ার প্রশ্নে পাকিস্তান তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই জনমতের অর্থ বাংলাদেশ পাকিস্তানের অনুসারী রাষ্ট্র হতে চায় না। বরং সাধারণ মানুষ চায় ভারত ও পাকিস্তান—উভয়ের সঙ্গেই স্বাভাবিক, ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। সহজ ভিসা, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক আদান–প্রদান এবং উত্তেজনাহীন কূটনীতিই তাদের প্রত্যাশা।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমিত থাকছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে এই দুই দল এগিয়ে রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের পক্ষে জনসমর্থন এই দলগুলোর প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশ্লেষকেরা এটাও বলছেন, বিএনপি সাধারণত ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণে আগ্রহী এবং ‘বাংলাদেশ আগে’ নীতিকে সামনে রেখে উভয় প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা দিতে পারে। অন্যদিকে জামায়াত ধর্মীয় ও আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, বরং নির্বাচনী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
















